ব্রেকিংসম্পাদকীয়সাহিত্য-সংস্কৃতিস্লাইডার

মাকে বড় বেশি মনে পড়ে

আজ মা’র মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৪ সালের ৪ এপ্রিল আমাদের মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন। দেখতে দেখতে কত বছর হয়ে গেল। কীভাবে সময় চলে যায়। মনে হয় এই সেদিন বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মায়ের পায়ের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখতে দেখতে যুগ পার হয়ে গেল তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সৌভাগ্য মা’র মৃত্যুবার্ষিকীতে পর্বটি পড়েছে। সব ভাই-বোন হয়তো আজ মা-বাবার কবরে যাবে না। কানাডা থেকে ছোট বোন শুশু এসেছে, ও যাবে। বেগমকে নিয়ে আমিও যাব। কুড়ি ইংল্যান্ডে, দীপ-কুশিও যেত কিন্তু কুশির পরীক্ষা, তাই ওরা ভাই-বোন যেতে পারবে না। আমরাই কবরের পাশে মসজিদে বাদ আসর মিলাদ পড়ব। মা’র ইচ্ছায় ছাতিহাটি বাবার পাশে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। আমিও আশা করি, মা-বাবার পায়ের কাছে আমার একটু জায়গা হবে। মা শুধু আমাদের জন্য, রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য সারা জীবন ভীষণ কষ্ট করেছেন। প্রিয় পাঠক, দয়া করে আল্লাহর দরবারে দোয়া করবেন আমাদের বাবা-মাকে যেন দয়াময় প্রভু ক্ষমা করেন, তাদের বেহেশতবাসী করেন।

আমি আর পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে চাই না। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার জন্য আওয়ামী লীগ ছেড়েছি, অনেক গালাগাল শুনেছি, কালো পতাকা দেখেছি, রাজাকারের আখ্যা পেয়েছি। তবু মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা হয়েছে। সেটাই বড় কথা। পুলিশ, মিলিটারি, বেসরকারি কর্মচারী চাকরিতে বেতন ও অবসরে ভাতা পান। তাহলে মুক্তিযোদ্ধারা কিছু সম্মানী পেলে অসুবিধা কোথায়? এখন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ১০ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়া হয়। যদি সম্মানই দেবেন একজন মুক্তিযোদ্ধা তার পরিবার নিয়ে যাতে সম্মানে থাকতে পারে সেরকম অন্তত ৫০ হাজার টাকা দিন। সরকারি কর্মচারীদের যেমন বছর বছর বেতন বাড়ানো হয়, তাদেরও সেরকম সম্মানী বাড়ান। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার শেষ পর্যন্ত খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীর ব্যবস্থা করেছেন। যেটা স্বাধীনতার পরপরই করা উচিত ছিল। ‘সাহসী খেতাব’ কোনো ফেলনা নয়। এক ক্লাসে শতজন পরীক্ষা দেয়, প্রথম হয় একজন। খেতাবও ঠিক তেমনি। খেতাবপ্রাপ্তরা ভালো আছে কী মন্দ, তা দেখার বিষয় নয়, সরকার, দেশ তাদের কতটা সম্মান দেখাচ্ছে সেটাই বিবেচ্য। কয়েক লাখ যোদ্ধা যুদ্ধ করেছে, তার মধ্যে খেতাব পেয়েছেন ৬-৭শ। গুণ বা যোগ্যতা না থাকলে তারা তা পেতেন না। পৃথিবীর সব দেশে ভালো কাজের পুরস্কার আছে। এখনো কত পুরস্কার দেওয়া হয়— স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পুরস্কার আরও কত কী। যারা মুক্তিযুদ্ধে অহংকার করার মতো কাজ করেছেন, সম্মান পেয়েছেন তাদের সম্মানী দিতে কৃপণতা হবে কেন? জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার সেই যুক্তিযুক্ত কাজটিই করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কোনো এক সাবেক সচিব রাজাকারের সন্তান মহাপণ্ডিত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার প্রশ্নে সরকারি সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে বলে দিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত এবং খেতাবপ্রাপ্ত এই তিনটির যে সম্মানী পরিমাণে বেশি তিনি শুধু সেই বেশিটিই পাবেন। মানে সচিব সাহেব সরকারের থেকে বড়, সরকারপ্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনার থেকে বড় বা অনেক বেশি ক্ষমতাবান।

বেশ কিছু বছর সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার জন্য সম্মানী দেওয়া শুরু হয়েছে। আমি দুই হাজার টাকা সম্মানী দাবি করেছিলাম অনেক বছর আগে। তখন দুই হাজার টাকায় একটা পরিবার যেভাবে চলত এখন ৫০ হাজার টাকায়ও সেভাবে চলতে পারবে না। যদিও মহামহিম সরকার ৩০০ টাকা থেকে শুরু করে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের এখন ১০ হাজার টাকায় বৃদ্ধি করেছে। কিন্তু এখনকার ১০ হাজার তখনকার পাঁচশ টাকার সমানও না। স্বাধীনতার পরপর মাননীয় মন্ত্রীদের বেতন ছিল দুই হাজার। এখন লাখ টাকা। তখন দুই হাজার টাকায় তারা যেভাবে চলতেন এখন লাখ টাকায়ও সেভাবে চলতে পারেন না। সে জন্যই সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দর-দামের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ব্যাপারে সাধুবাদ না জানিয়ে পারা যায় না। তাই আন্তরিকভাবেই সাধুবাদ জানাই। কিন্তু নানা অসঙ্গতি মুক্তিযোদ্ধাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। সবার মনে রাখা দরকার- এক ফুল গাছে ফুলের বাগান হয় না, এক দলে দেশ চলে না। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা এখনো যে পূর্ণাঙ্গ নয় এটা শতসিদ্ধ সবার জানা। এটা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জাতীয় দৃষ্টি নিয়ে আন্তরিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে বিরক্ত হয়ে গালাগাল করলে যারা সারাদিন কড়কড়ে রোদে পুড়েন তারা কী করবে? ধৈর্য মস্তবড় শক্তি। ধৈর্যের চেয়ে বড় কিছু নেই। আর আচার-ব্যবহারে বংশ পরিচয়। কত মানুষ কত আশা নিয়ে আসে তাকে হেয় বা ছোট করা কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাজ নয়। তাদের গালাগাল করা তো নয়-ই, রাজাকার-আলবদর-আলশামসে নাম নেই এমন মানুষকে সব সরকারের সবসময় সম্মান করা উচিত। তারা প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধ না করলেও অন্তত মুক্তিযোদ্ধাদের ছায়া মাড়িয়েছেন। তাই প্রবীণদের ছোট করা উচিত নয়।

যখন যৌবন ছিল, ছোট ছিলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তখন কিছুটা গৌরববোধ করতাম। কেন যেন সেই গৌরবও ফিকে হতে চলেছে। যে দেশের জন্য রক্ত দিয়েছি, সেই দেশ এখন খুব একটা ভালো নেই। দেশ ভালো থাকুক, ভালো চলুক একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সে জন্য মনটা যে কতটা আকুলি-বিকুলি করে কাউকে বলে কয়ে বোঝাতে পারব না। সারা জীবন দেখেছি মুমূর্ষু রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠায়। র‌্যাবের পরিচালক কর্নেল আজাদকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে ফিরিয়ে এনে সিএমএইচে রাখা হয়েছিল। মানে তিনি নেই চলে গেছেন, তবু সময়ের আগে বলা যাবে না। সেদিন কুমিল্লা নির্বাচন হলো। এতকাল শুনেছি পরাজিত প্রার্থী নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এবার বিজয়ী প্রার্থী অভিযোগ এনেছে। তার কথা একেবারে ফেলে দিলে চলবে না। চিন্তা করা দরকার। আরও চিন্তার বিষয়, ৭ তারিখ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারত যাবেন। কী পাবেন তা তিনিই জানেন। কারণ দেশ পরিচালনায় দেশের মালিক জনগণ কিছুই জানে না। সব কিছু অবাক করার মতো! মুক্তিযুদ্ধে ভারত ছিল আমাদের প্রথম এবং প্রধান বন্ধু। নানা কারণে ভারত এখন সেই অবস্থানে নেই। তেমন থাকার সুযোগও নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময়, চীন, আমেরিকা ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। সেই চীন-আমেরিকা এখন আমাদের কাছে ভারতের চেয়ে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ। দক্ষ যোগ্য অভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী কী করবেন তা তিনিই জানেন। তবে কোনো সামরিক চুক্তি করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য সেটা খুবই অস্বস্তির হবে। স্বাধীনতার পরপর ২৫ বছরের ভারত-বাংলাদেশ শান্তি ও সহযোগিতা চুক্তি হয়েছিল। ওপেন চুক্তিকে গোপন বলে কত বদনাম করা হয়েছিল। এত বছর পর যদি সত্যি সত্যি কোনো সামরিক চুক্তি হয় সেটা কেমন হবে, বলা মুশকিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভেবেচিন্তে পা ফেলবেন। আমাদের পরামর্শের দরকার হবে না।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close