জেলা সংবাদ

লিবিয়া গিয়ে ‘মাফিয়াদের’ হাতে বন্দী ছেলেকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন মা

অনলাইন ডেস্ক।

লিবিয়ায় মাফিয়াদের হাতে আটক হয়েছিল ছেলে। উদ্ধারের কোনো উপায়ই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু মায়ের মন তো মানে না। তাই ছেলেকে উদ্ধারে নিজেই পাড়ি জমালেন লিবিয়া। আর দুঃসাহসিকভাবে ছেলেকে উদ্ধার করলেন কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ওই মা। তবে এ কাজে তাকে সহায়তা করে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস ও জাতিসঙ্ঘের অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।

ওই মায়ের নাম শাহিনুর বেগম। তিনি দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী আবুল খায়েরের স্ত্রী।

সোমবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে শাহিনুর বেগম জানান, অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে একমাত্র ছেলে ইয়াকুব হাসানকেও (২০) ২০১৯ সালের মে মাসে দালালদের মাধ্যমে টুরিস্ট ভিসায় লিবিয়ায় পাঠান তিনি। বেনগাজিতে একটি তেলের কোম্পানিতে কাজ শুরু করে ইয়াকুব। বাংলাদেশী টাকায় প্রতিমাসে ৩৫ হাজার টাকা বেতন পেত সে। বাবা আর ছেলে লিবিয়ায় কাজ করে যে টাকা আয় করতো তাতে তাদের সংসারে অনেকটাই সচ্ছলতা আসে। ছেলেকে লিবিয়া পাঠানোর পর প্রথম দুই বছর ভালোই চলছিল তাদের সংসার। তবে ইয়াকুব স্বপ্ন দেখে আরেকটু উন্নত জীবনের। সেই স্বপ্নই হয়ে ওঠে দুঃস্বপ্ন। অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ‘মাফিয়াদের’ হাতে আটক হয় ইয়াকুব। তারপর থেকেই তাদের সুখের সংসারে বিপর্যয় নেমে আসে।

‘আশপাশের পরিচিতরা সবাই বলছিল, আমার ছেলে মারা গেছে। অনেকে বলে, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমার একটাই ছেলে, তাই তাকে উদ্ধারের জন্য চার দফায় দালালকে প্রায় ২০ লাখ টাকা দিয়েছি। ছয় মাস ধরে ছেলের কোনো খবর না পেয়ে আমি ঠিকমতো খেতে পারিনি, ঘুমাতে পারিনি। শুধু কেঁদেছি আর আল্লাহর কাছে ছেলেকে ভিক্ষা চেয়েছি। গরু-ছাগল, জমিজমা বিক্রি করে, বন্ধক রেখে ছেলের মুক্তির জন্য টাকা পাঠিয়েছি। সব টাকা দালালরা খেয়ে ফেলেছে,’ বলেন তিনি।

লিবিয়ার যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে শাহিনুর বলেন, ‘আমার ছেলে নিখোঁজ, সেই খবরে স্বামী স্ট্রোক করেন। এক একটা দিন যেন এক একটা বছরের মতো মনে হচ্ছিল। পাগলের মতো ছুটে বেড়াতাম। তখন নিজেই লিবিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। নিজেই গিয়ে পাসপোর্ট করি। পরে মেয়ের জামাইয়ের সাথে ঢাকা যাই। ফকিরাপুল এলাকায় একজনের মাধ্যমে ভিসা ও উড়োজাহাজের টিকেটের ব্যবস্থা করি। সব মিলিয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা খরচ হয়। গত জানুয়ারির ৯ তারিখে আমাদের ফ্লাইট ছিল। প্রথমে দুবাই যাই। সেখানে এক দিন থেকে মিসরে যাই। মিসরেও ২৪ ঘণ্টা যাত্রাবিরতি ছিল। তারপর লিবিয়ার বেনগাজিতে স্বামীর কাছে পৌঁছাই। তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন। তাকে দেখাশোনার পাশাপাশি ছেলের খোঁজ করতে থাকি।’

লিবিয়ায় কিভাবে ছেলের খোঁজ পেলেন জানতে চাইলে শাহিনুর বেগম বলেন, ‘প্রথমে সেখানে বাংলা ভাষা জানেন এমন কয়েকজনকে খুঁজে বের করে তাদের কাছে সব খুলে বলি। তারা আমাকে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জাতিসঙ্ঘের অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন। দূতাবাস ও আইওএম’র কর্মকর্তারা সব শুনে আমাকে সাহায্য করেন।’

‘আইওএম কর্মকর্তারা লিবিয়া সরকারের সাথে যোগাযোগ করে ইয়াকুবকে উদ্ধার করেন। তারা ফোনে আমার সাথে ওর কথা বলিয়ে দেন। ফোনে যখন ছেলের কণ্ঠ শুনি তখন হাউমাউ করে কেঁদে উঠি। আমার ছেলেও ওপাশ থেকে কান্না করতে থাকে। ছেলেকে দেখার জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু লিবিয়ায় আমাদের দেখা হয়নি। ছেলে তখন ত্রিপলিতে ছিল, আর আমি বেনগাজিতে।’

আইওএম ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় শাহিনুর বেগম ৮ মার্চ বেনগাজি থেকে এবং ইয়াকুব ১৬ মার্চ ত্রিপলি থেকে ঢাকায় ফেরেন। লিবিয়া থেকে ফেরার পর তাদের রাখা হয় আশকোনার হজ ক্যাম্পে। গত ২১ মার্চ শাহিনুর ও ইয়াকুব ফেরেন দেবিদ্বারের নিজ বাড়িতে।

ইয়াকুব হাসান জানান, জাহাঙ্গীর নামের একজনের পরামর্শে ২০২১ সালের শুরুর দিকে অবৈধভাবে সাগরপথে ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা করি। ইতালি যাওয়ার জন্য রফিক নামের এক দালালকে ৪ লাখ টাকা দিই। প্রথমে গাড়িতে করে বেনগাজি থেকে ত্রিপলিতে নেয়া হয়। সেখান থেকে রাতে নৌকাযোগে ইতালির ল্যাম্পিদুসা দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়। নৌকাতে ৩০০ জন যাত্রী ছিলেন, তাদের মধ্যে ১৫০ জন বাঙালি। নৌকার মাঝির ওয়ারলেস চালু থাকায় যাত্রার শুরুতেই আমাদের নৌকা লিবিয়ার কোস্টগার্ডের কাছে ধরা পড়ে। এদিন সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজার মানুষকে আটক করা হয়। যাদের পরিচিত ছিল তাদেরকে ঘাট থেকে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়া হয়। আমিসহ অন্যদের জেলে পাঠানো হয়।’

তিনি আরো জানান, ‘জেলে আমাদের খুব অত্যাচার করা হতো। খাওয়ার জন্য একটা রুটি আর পানি দিত। ২২ দিন জেলে থাকার পর কোস্টগার্ডকে ৪ লাখ টাকা দিয়ে আমি ছাড়া পাই।’

এই ঘটনার প্রায় ৮ মাস পর আবারো ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন ইয়াকুব। এবার তার বিপদ আরো বেড়ে যায়। এ সময় ‘মাফিয়ারা’ তাকে বন্দি করে নিয়ে যায়।

‘মাফিয়ারা আমাদের মোবাইল, টাকা, কাপড়চোপড় সবকিছু নিয়ে নেয়। তারা আমাদের জিম্মি করে। কবরের মতো ছোটো একটি ঘরে আমাদের সাত দিন রাখা হয়। ঘরটিতে কোনো আলো-বাতাস ছিল না। শুধু অন্ধকার। সপ্তাহে ২-৩ দিন পর পর খাবার দেয়া হতো। আমাদের প্রতিদিন একবার ঘর থেকে বের করে তারা মারতো। হাতের কাছে যা পেতো তা দিয়েই মারতো। কিছু দালালের মাধ্যমে তারা সবার পরিবারকে জিম্মি করার বিষয়টি জানায়।’

‘সেখান থেকে বের করে আমাদের গরু জবাই করা হয় এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছুদিন রেখে আরেকটি জায়গায় নেয়া হয়। সেখানে প্রায় ৩০০ জনকে একটি রুমে রাখা হয়। প্রতিদিন এখানে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে মারা যান। দীর্ঘদিন খাবার না পেয়ে অনেকের পেটের সমস্যা হয়েছিল। অনেকের শরীরে ঘা হয়েছিল, শরীর থেকে পুঁজ পড়ছিল। আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘা হয়। তারা কোনো চিকিৎসা বা ওষুধ দিতো না।’

কয়েকজন বাঙালি তাদের ওপর অনেক বেশি অত্যাচার করতেন উল্লেখ করে ইয়াকুব বলেন, ‘আমাদের যেখানে রাখা হয় সেখানে সাতজন বাংলাদেশী আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। তাদের একজনের নাম সুজন। বাকিদের নাম মনে নেই। তারাও মাফিয়াদের হাতে অনেক আগে ধরা পড়েছিলেন। তবে তারা মাফিয়াদের কিছুটা বিশ্বস্ত। এই সাতজন আমাদের নিয়মিত মারতেন। কোনো কথা ছাড়াই হাতের কাছে যা পেতেন তাই দিয়ে মারতেন। তাদের কোনো মায়া-দয়া ছিল না। তারাই আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছেন। আমাদের ৩০০ জনের জন্য প্রতিদিন ৩০০টি রুটি দেয়া হতো। এই সাতজন ৩০টি রুটি রেখে বাকি ২৭০টি আমাদের দিতেন। আমরা সেগুলো ভাগ করে খেতাম।’

‘আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা একজনকে অনেক অনুরোধ করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার ফোনটি নেই। আমি শুধু বাবাকে জায়গার নাম বলি এবং কাউকে আর কোনো টাকা না দেয়ার জন্য বলি। কারণ সব টাকা দালালরা খেয়ে ফেলেন। বাবার সাথে আমার ১৭ সেকেন্ড কথা হয়েছিল।’

ইয়াকুব আরো জানান, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে একদিন একজন এসে আমার ও আমার বাবার নাম বলেন। আমি তখন তার সাথে কথা বলি। তিনি আমার ছবি তুলে নেন। সেদিন খুব খুশি হই। কারণ, বুঝতে পারছিলাম এবার ছাড়া পাব।’

শাহিনুর বেগম বলেন, ‘ছেলেকে আর কোথাও যেতে দেব না। সরকার যদি আমাদের টাকাগুলো দালালদের কাছ থেকে উদ্ধার করে দেয়, আমাদের খুব উপকার হবে। আমি আইওএম’র কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তারা আমার ছেলেকে উদ্ধার করে দিয়েছে।’

অবৈধভাবে টুরিস্ট ভিসায় ছেলেকে পাঠানোর কারণ জানতে চাইলে শাহিনুর বেগম বলেন, ‘অনেক অভাবে ছিলাম। আর বৈধভাবে পাঠানো সম্ভব ছিল না।’

কষ্টে থাকলেও অবৈধভাবে সাগর পথে যেন কেউ ইতালি না যায়, বলেন তিনি।

শাহিনুর বেগম এক ছেলে ও দুই মেয়ের জননী। তার স্বামী লিবিয়ায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে।

 

এ সম্পর্কিত আরও খবর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরিও দেখুন
Close
Back to top button