জাতীয়

জনগণ কি সত্যিই জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে আছে?

 

সম্প্রতি জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে দলটির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জি এম কাদের নামেই বেশি পরিচিত) বলেন, দেশের মানুষ ১৯৯১ সালের পর থেকে অচল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দেখছে। দেশের মানুষ পরিবর্তন দেখতে উন্মুখ হয়ে আছে। সাধারণ মানুষের বিচার বিশ্লেষণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তুলনায় জাতীয় পার্টির রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশের মানুষ বেশি সুশাসন ভোগ করেছে। তাই, দেশের মানুষ জাতীয় পার্টির দিকে এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। দেশের মানুষ আবারো জাতীয় পার্টিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় দেখতে চায়।

গেলো ফেব্রুয়ারি মাসেও বনানী কার্যালয়ে এক সভায় বক্তৃতাকালে জি এম কাদের বলেছিলেন, আগামী দিনের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠবে। পরিচ্ছন্ন ইমেজের জন্য দেশের মানুষ অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে আছে। দেশের তরুণ সমাজের সামনেও জাতীয় পার্টি অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

এ ছাড়া সমাজে ক্লিন ইমেজের বিশিষ্টজনরাও জাতীয় পার্টিতে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও জাতীয় পার্টিতে যোগ দিতে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

এর আগে ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় যুব সংহতি কেন্দ্রীয় কমিটি আয়োজিত সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জি এম কাদের বলেছিলেন, দেশের মানুষ এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে রাজনীতি করছি।

২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর জাতীয় পার্টি ঢাকা জেলার দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে কাদের বলেছিলেন, দেশের মানুষ জাতীয় পার্টিকে বিকল্প শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। দেশের প্রধান তিনটি শক্তির মধ্যে জাতীয় পার্টিই এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য দল। মানুষ চায় জাতীয় পার্টি আরও শক্তিশালী দল হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে দেশকে উন্নয়ন ও প্রগতির দিকে এগিয়ে নেবে। তিনি জানান, দেশের মানুষ এক বুক প্রত্যাশা নিয়ে জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে আছে।

এছাড়াও, ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টির তৎকালীন সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান (বর্তমানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক) রওশন এরশাদ বলেছিলেন, জনগণের জন্য জাতীয় পার্টিকে আবার ক্ষমতায় আসতে হবে। আর এবার আমাদের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যা যা করা দরকার, তা করতে হবে। কারণ জনগণ জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে আছে।

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ নিজেও প্রায় সব বক্তৃতায় বলতেন- দেশ ও জাতির স্বার্থে জাতীয় পার্টির বিকল্প নেই। মানুষ এখন জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে আছে।

শুধু শীর্ষ নেতারাই নন, দলটির সর্বস্তরের নেতাদের মুখেও সবসময় ওই একই বুলি- মানুষ এখন জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে আছে।

বাস্তবতা কি বলছে?

দেশে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করে, অতঃপর জাতীয় পার্টি নামে দল গঠন করে একটানা মোট নয় বছর দেশ শাসনের পর প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের পতন হয়েছিল। ক্ষমতায় থাকাকালে কিছু গৃহপালিত বিরোধী দল তৈরি করে ‘সমর্থন’ আদায় করলেও মূল ধারার বিরোধী দলগুলোর কেউই তাকে মেনে নেয় নি।

এরশাদের পতনের পর তিনি জেলে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেই নির্বাচনে (পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন) জাতীয় পার্টি সদ্য সাবেক ক্ষমতাসীন দল হিসেবে ৩৫ টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু জেলে থেকেও রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে এরশাদ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, নিজ এলাকায় এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তুমুল।

ওদিকে, জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা এবং ভোট কমতেই থাকে। সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত পরবর্তী নির্বাচনেই (সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে- ১৯৯৬) জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা আরো কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৩২ টিতে। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০০১) জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা (ইসলামী জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট-এর প্রার্থীসহ) কমতে কমতে তলানিতে (১৪ টি) গিয়ে নামে।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০০৮) জাতীয় পার্টি ২৭ টি আসন পেলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা ফের কমে দাঁড়ায় ২২ টিতে।

মাঝে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৪) জাতীয় পার্টি ৩৪ টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু তখনকার সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল।

জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা এবং ভোট যে ক্রমশ কমছে সে বিষয়টি প্রকাশ্যে না হলেও ঘরোয়া আলোচনায় স্বীকার করেন স্বয়ং দলটির শীর্ষ নেতারাও। বছর তিনেক আগে এক সাক্ষাৎকারে জাতীয় পার্টির তৎকালীন কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, “হয়তো কিছু সমর্থক আমাদের কমে গেছে, এটা বাস্তবতা”। এর কারণ ব্যখ্যা করেন তিনি এভাবে- ক্ষমতার বাইরে থাকলে যে কোন বড় রাজনৈতিক দলের অনেক সময় সমর্থকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা দেয়া বা সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও দুর্বল হতে হয়।

এছাড়াও, দীর্ঘ ছয় বছর এরশাদের জেল খাটা, বিভিন্ন মামলায় তার দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং অনেক মামলা ঝুলে থাকার কারণে তিনি বা তার দল জাতীয় পার্টি কখনোই স্বাধীন অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করতে পারে নি বলেও দলটির সমর্থকরা দাবি করে থাকেন।

-দৈনিক মানবজমিন থেকে

এ সম্পর্কিত আরও খবর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button