জাতীয়

ফের বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক: আবারো বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। চলতি মাসের শুরু থেকে বাড়ছে শনাক্ত রোগী। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধিতে হেলাফেলায় এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। ভ্যাকসিন নেয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। হাটে-বাজারে, জনসমাগমস্থলে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। যানবাহনে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
সংক্রমণ বাড়ায় তিন দফা নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া নির্দেশনা সাংবাদিকদের জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় আবারো উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার ঘোষণা থাকলেও তা খোলা যাবে কিনা এ নিয়ে আবার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংক্রমণ পরিস্থিতি আরো বাড়লে সবকিছু আবার বদলে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চলতি মাসের শুরু থেকেই করোনার সংক্রমণ ফের ঊর্ধ্বমুখী। নমুনা বিবেচনায় গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। আগের দিন যা ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। মাঝখানে কিছুদিন কমতে শুরু করলেও আবার প্রতিদিন বাড়ছে করোনায় শনাক্ত ও মৃত্যু। গত কয়েকদিন করোনা শনাক্ত ৬০০-এর নিচেই অবস্থান করছিল। কিন্তু সোমবার তা হুট করে বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪৫ জনে। গতকাল এই সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছেন ৯১২ জন। এখন পর্যন্ত শনাক্ত ৫ লাখ ৫২ হাজার ৮৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরো ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হিসাবে মোট মৃত্যু হয়েছে ৮ হাজার ৪৮৯ জনের।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনার নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৭ হাজার ৯৭৩টি এবং অ্যান্টিজেন টেস্টসহ নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৭৫টি। এখন পর্যন্ত ৪১ লাখ ৮০ হাজার ৯৩৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ২২৯ জন জন, এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৫ হাজার ৩৪৯ জন। নমুনা বিবেচনায় গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত ১৩ দশমিক ২০ শতাংশ শনাক্ত হয়েছেন। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং মারা গেছেন ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ১৩ জনই পুরুষ। এখন পর্যন্ত পুরুষ ৬ হাজার ৪২০ জন এবং নারী মৃত্যুবরণ করেছেন ২ হাজার ৬৯ জন। বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬০ বছরের উপরে ৫ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৫ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ২ জন এবং ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১ জন মারা গেছেন। বিভাগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১০ জন, চট্টগ্রামে ১ জন, বরিশালে ১ জন এবং রংপুরে ১ জন মারা গেছেন। ১৩ জনই হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন।
নিবন্ধন সাড়ে ৫২ লাখ, টিকাগ্রহীতা ৪০ লাখ মানুষ: সারা দেশে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরুর ২৬তম দিনে গতকাল ভ্যাকসিন নিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৪৬৩ জন। এর মধ্যে ঢাকায় নিয়েছেন ২১ হাজার ৬৫ জন। এ পর্যন্ত দেশে মোট টিকা নিয়েছেন ৪০ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৫ লাখ ৬০ হাজার ৫০৬ জন এবং নারী ১৪ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫৭ জন। টিকা নেয়ার পর সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে মোট ৮৬৬ জনের। অন্যদিকে গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত টিকা নিতে অনলাইনে মোট নিবন্ধন করেছেন ৫২ লাখ ৫১ হাজার ৯৩৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস’র গতকালের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ঢাকা মহানগর ব্যতীত ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতে টিকা নিয়েছেন ১৪ হাজার ৯২০ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ হাজার ২৫৮ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ হাজার ৬৯৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ১১ হাজার ৭৫৬ জন, রংপুর বিভাগে ১১ হাজার ৪৬ জন, খুলনা বিভাগে ১৬ হাজার ৮৪০ জন, বরিশাল বিভাগে ৪ হাজার ৫৩১ জন এবং সিলেট বিভাগে টিকা নিয়েছেন ৩ হাজার ৫৭৪ জন। গত ২৭শে জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে গণটিকাদান শুরু হয় ৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে।

কেন বাড়ছে সংক্রমণ: দেশে ফের বাড়ছে করোনার সংক্রমণ। গণটিকাদান কর্মসূচির মধ্যেই সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী আচরণ। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। মাস্ক পরা ছেড়ে দিয়েছেন। সামাজিক সমাগমও বেড়ে গেছে। গরমের কারণে অনেক লোক বদ্ধ ঘরে থাকছেন, ফ্যানের বাতাস এবং এসির ঠাণ্ডা নিচ্ছেন। এতে সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব কারণে করোনা বাড়ছে বলে তারা মনে করে। এ বিষয়ে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। না হলে বিপদ আসতে পারে।

সংক্রমণ ফের বাড়ছে কেন- জানতে চাইলে জাতীয় পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, সংক্রমণের হার বেড়ে ৫ ছাড়িয়েছে। টিকা নিলেও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের এখানে শীতকালীন কিছু রেসপেটরি ভাইরাস আগের থেকেই ছিল। দেশের ভাইরোলজিস্ট বলেন, শীতকালে আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের এখানে বাড়েনি। এটা কেন হয়েছে সে বিষয়ে আমরা কিন্তু ওভাবে গবেষণা করিনি। তবে আমাদের একটি হাইপোথিসিস (ধারণা) হচ্ছে শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা-এ-ভাইরাস, প্যারা ইনফ্লুয়েঞ্জা, রাইনোসহ মোট চারটি ভাইরাস বিপুলভাবে সংক্রমিত হয়। এ সময় সাধারণ মানুষ, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়। ভাইরোলজিতে একটি কথা আছে দেহে যদি একটি ভাইরাস আগে প্রবেশ করে তাহলে পরবর্তীতে অন্য ভাইরাসও প্রবেশ করে। যেটাকে ভাইরাল ইন্টারফেয়ার বলে। শীতকালে প্রচণ্ড শীত থাকলেও তখন করোনা ভাইরাসটি কমে গেল। এখন যেহেতু আমাদের দেশীয় ভাইরাস শীতের জন্য গ্রো (জন্মানো) করেছিল সেটা এখন কমে গেছে। এখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয়তো কিছুটা বাড়তেও পারে। মার্চ মাস থেকে সংক্রমণটা বেড়েছে। স্যালো একটি ওয়েভ আমাদের এখানে হয়তো আসছে। তাই সংক্রমণ এড়াতে অবশ্যই নিয়মিত মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে বলে এই জনস্বাস্থ্যবিদ মনে করেন। এই বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন রয়েছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং সংস্থাটির উপদেষ্টা এই বিষয়ে ডা. মুস্তাক হোসেন মানবজমিনকে বলেন, আমরা স্বাস্থবিধি মানছি না। সামাজিক গেদারিংও বেড়ে গেছে। গরমে অনেক মানুষ বদ্ধ ঘরে থাকেন, ফ্যানের বাতাস এবং এসির ঠাণ্ডা নিচ্ছেন। এতে করোনা সংক্রমণ ছড়ায় বলে তিনি মন্তব্য করেন। জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, গত কয়েকদিন করোনার সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এটা বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই আমাদেরকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। যেভাবে শীতকে সামনে রেখে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। টিকা নিলেও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। না হলে সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তিন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ: করোনাভাইরাস সংক্রমণ ফের বাড়তে থাকায় মাস্ক পরাসহ তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এ কথা জানান। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে মন্ত্রিসভার এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আমরা যে যেখানে আছি টিকা নিই বা না নিই, তিনটি বিষয় বলেছেন প্রধানমন্ত্রী, অবশ্যই যেন মাস্ক ব্যবহার করি, যথাসম্ভব যেন সতর্কতা অবলম্বন করি আর তৃতীয়টি হচ্ছে পাবলিক গ্যাদারিং যেখানে হচ্ছে সেখানে যেন লিমিটেড সংখ্যায় থাকি। নিজেরও যেন দায়িত্ববোধ থাকে বেশি সংখ্যক লোক যেখানে আছি সেখানে যেন না যাই। যারা যাবে তারা যেন স্বাস্থ্যবিধি অনুগ্রহ করে মেনে চলি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সভায় কোভিডের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আমরা একেবারে কমফোর্ট জোনে আছি- এটা যেন চিন্তা না করি। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা ভালো আছি, তবে এটি নিশ্চয়তা দেয় না যে, একেবারে আমরা কমফোর্ট জোনে আছি। গত কয়েকদিন ধরে এক্সপার্টরা আলোচনা করছেন যে, আমরা যেন খুব কমফোর্ট ফিল না করি। কারণ গত বছর খুব পিকে উঠেছে সামারে, এ বছর যে উঠবে না তার নিশ্চয়তা নেই। তিনি বলেন, আমরা যেটা মনে করেছিলাম শীতকালে পিকে চলে যাবে। আমাদের পিক ছিল হাই সামারে, সুতরাং মে-জুন মাস হাই সামার হবে। এক্সপার্টরা যা বলছে সে দিকটাও দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে, যেন আমরা যার যার জায়গা থেকে কেয়ারফুল থাকি। মাস্ক বাধ্যতামূলক করার জন্য প্রশাসন মাঠে নামবে কিনা এমন প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, দেখি আমরা বিষয়টা। আমরা প্রচার করছি যে, একটা ভ্যাকসিন নিলে বিজ্ঞানীরা বলছে না যে আপনি পুরোপুরি নিরাপদ, ভ্যাকসিন নিলেও মাস্ক পরতে বলা হয়েছে। টিকা নেয়ার প্রবণতা কমার বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এটা নিয়ে দুই-একদিনের মধ্যে কথা বলবে। সংক্রমণ ঠেকাতে কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে কিনা, এ প্রশ্নে সচিব বলেন, আগামীতে অবস্থা কেমন হয় মে মাসে গিয়ে দেখা যাবে। গ্রামে-গঞ্জে এ বিষয়ে মোটিভেশনাল কাজ করা হচ্ছে। লকডাউন বিষয়ে তিনি বলেন, লকডাউনের বিষয়ে ওইভাবে চিন্তা করিনি। যদি সংক্রমণ বাড়ে তাহলে আবারো বসবে। মানুষের জীবন ও জীবিকা এ দুটো ব্যালেন্স করেই তো আমরা কাজ করে আসছি।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরিও দেখুন
Close
Back to top button