ফেসবুক কর্নার

জাহাজে যোগদানের গল্প

মাহমুদুল হাসান

জাহাজী জীবন মানেই নীল সমুদ্রের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বেচ্ছায় কারাবরণ। বেদনার রং নীল, জাহাজীদের বেদনায় সমুদ্রও নীল। এই নীল জল লোনা হয়েছে কতশত নাবিকের লোনা কান্নায় তার কোন হিসাব নেই। নুহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিশতির নাবিক থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রতিটি নাবিকের বেদনার উপাখ্যান রচিত হয়েছে এই জলে। সমুদ্রের ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে সেই সব ইতিহাস।
ফাঁসির হুকুমপ্রাপ্ত মানুষটির আয়ু ফুরিয়ে আসছে। তারিখ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এই ধরাধাম ত্যাগের। প্রতিটি মুহূর্তই জানান দিচ্ছে প্রিয়জনদের ছেড়ে যাওয়ার অসহনীয় কষ্টের। সময় বয়ে যাচ্ছে। চির বিচ্ছেদের সময় এই এলো বলে। এই সময়ে তার যে অনুভূতি হয়, জাহাজীর জাহাজে যোগদানের সময়ের অনুভূতিটাও অনেকটা তেমন। জাহাজে যোগদানের দিন যত কাছে আসে, ততই গৃহত্যাগী জাহাজীদের দীর্ঘশ্বাসে আকাশ ভারি হয়ে উঠে।
অফিস থেকে কল দিয়েছে। জানুয়ারীর ২১ তারিখ চট্টগ্রামে থাকতে হবে। এর আগে ১৯ তারিখে করোনা পরীক্ষা করতে হবে। ২০ তারিখে পরীক্ষার রেজাল্ট নেগটিভ হলে রওয়ানা দিতে হবে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে । যোগদানের খবর আসতেই খাবারে রুচি চলে গেছে। আয়িশামণির দিকে তাকালেই হ্রদয় হু হু করে ওঠে। জাহাজ থেকে নামার পর চারমাস কেটে গেছে। এই চার মাসে বহুবার তাকে জাহাজে যাওয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে।সে রাজি হয় নি। তার আব্বু জাহাজে যাবে না। জাহাজে না গেলে তোমাকে খেলনা কিনে দিবে কিভাবে?? টাকা পাবে কোথায়? ওর উত্তর আল্লাহ দিবে বা নানুমণির কাছ থেকে নিবে। পথশিশুদের প্রতি তার অনেক মায়া। পথশিশুদের সাহায্য করতে হবে, এরজন্য আমার জাহাজে যাওয়া প্রয়োজন। এটা বললে মাঝে মাঝে রাজি হতো, পরক্ষণেই বলতো জাহাজে যাবে না। বারবার বলায় শেষের দিকে এসে সম্মতি দিয়েছে।
১৯ তারিখ সকালে ময়মনসিংহে করোনা পরীক্ষা জন্য গিয়েছিলাম। ময়মনসিংহ শহরে শুধুমাত্র এস কে হাসপাতালেই করোনা পরীক্ষা করা হয়। বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে ১৫০০ টাকা জমা দিয়ে তালিকাভুক্ত হলাম৷ সমস্যা দেখা দিয়েছে পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া নিয়ে। কোম্পানির নির্দেশনা হচ্ছে
চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে চব্বিশ ঘন্টায় রিপোর্ট দেওয়া যাবে না। বন্ধু ডাঃ সোহান বলেছিল একদিনেই হয়ে যাবে, সমস্যা হলে সে দেখবে। এস কে হাসপাতাল থেকে নমুনা জমা দেওয়ার জন্য আরেক জায়গায় পাঠালো। দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর দুপুর বারোটায় নমুনা নেওয়া শুরু হলো। যিনি নমুনা নিয়েছেন, তার বাসা মুক্তাগাছায়। কক্ষে ঢুকতেই হাতে একটি কাগজ দিয়ে বললেন, রাতে কল দিয়েন। আমিও আগ্রহ নিয়ে বললাম, ভাই আমার বাসাও তো মুক্তাগাছায়, আমার তো আগামীকালই রিপোর্ট লাগবে। উনি বললেন, সমস্যা নেই, রাতে কল দিয়েন অথবা বিকালে মুক্তাগাছায় দেখা করতে পারেন। এই ফাঁকে নমুনা নিয়ে নিলেন। ঠিকমতো নিয়েছেন বলে মনে হলো না। এর আগে চীনে দুইবার নমুনা দিয়েছিলাম। ব্যাপারটা এতো সহজ ছিলো না। এখানে নমুনা নেওয়ার সময় টেরই পেলাম না। কক্ষ থেকে বের হয়ে বাহিরে দাঁড়ালাম। পরবর্তী জন বের হলে জিজ্ঞেস করলাম চিরকুট দিয়েছে কিনা। তাকেও দিয়েছে। এখানেও কারসাজি চলে, পজিটিভ নেগেটিভ হয় কিনা কে জানে। যদিও নমুনাগুলো সরাসরি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে চলে যায়। সেখান থেকেই ফলাফল আসে।
২০ তারিখ সকাল থেকেই পিঠের মাঝ বরাবর মেরুদন্ডের দুই পাশে ব্যথা। বড়ভাই রিপোর্ট আনার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে গিয়েছে। ডাঃ সোহান তার স্যারকে অনুরোধ করেছে আমার ফলাফলটা একটু আগে দেওয়ার জন্য। দুপুরের দিকে মোবাইলে বার্তা এলো। করোনা নেগেটিভ। তবে পিঠের ব্যথাটা বাড়ছেই। সোহানের সাথে পরামর্শ করা হলো। ব্যথাটা আপাত দৃষ্টিতে গ্যাস্ট্রিকের মনে হচ্ছে।
বিকালের দিকে ব্যথা আরো বেড়ে গেল। আছর ও মাগরিব সালাত বসে পড়তে হয়েছে। আয়িশামনির দিকে তাকালেই খুব খারাপ লাগছে। উম্মে আয়িশা ও আয়িশামনি লাগেজ গুছিয়েছে। আমি জাহাজে চলে যাব বললে, আয়িশামনি বলছে, সবকিছু এলোমেলো করে ফেলি, তাহলেই তো আব্বু যেতে পারবে না। আয়িশামনি দেখতে আমার মতো হয়েছে। দাঁতের গড়ন, হাত-পা, চোখ সব আমার মত। আয়িশামনি মাঝে মাঝে বলতো তুমি জাহাজে যেও না, তোমার সাথে আমার কত মেচিং, তুমি চলে গেলে আমার যে খারাপ লাগে। এই কথাগুলো সরাসরি বুকে আঘাত করে। মেয়েটা এইটুকুন বয়সেই কত কষ্ট পাচ্ছে। ওর বড় আব্বু এখন বাসায়। আমি বলেছি, সমস্যা নেই তোমার বড় আব্বু তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। আয়িশামনি বলে, তুমি বড় আব্বুকে বলে দাও কোথায় কোথায় নিয়ে যাবে। আমার আদরের ধনকে রেখে চলে যেতে হবে, কতদিন দেখা হবে না, বেড়াতে যাওয়া হবে না।
এশার নামাজ খুব কষ্ট করে পড়তে হয়েছে। গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। বড়ভাই সাথে যেতে চাইছে। গাড়িতে সিট থাকলেই হয়। চোখের জলে দাঁড়ি ভিজিয়ে বাসা থেকে বের হলাম৷ আয়িশামনির কেমন লাগছে কে জানে। উম্মে আয়িশা বরাবরের মতোই চোখের জলে ভাসছে। কয়েকদিন ধরেই যা চলমান। কেন যে নিজের ইচ্ছায় এই জীবন বেছে নিয়েছি, এই আফসোস যেন শেষ হওয়ার নয়।
আব্বু আর ভাইয়ার সাথে বাসস্ট্যান্ডে এলাম। আব্বু হাত ধরে নিয়ে এলেন। বাসে কোন ছিট খালি নেই। ভাইয়া যেতে পারছে না। বাসে ওঠার আগে ভাইয়া আমাকে জরিয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। এমন বড়ভাই খুব কম মানুষের ভাগ্যে জুটে। এখনও পর্যন্ত আমার কোন চাওয়া সে অপূর্ণ রাখেনি। চাকরি করছি কত বছর ধরে, কত দেশে গিয়েছি, তবুও নিজের জন্য কোন প্রযুক্তিপণ্য কিনি। কেনার প্রয়োজনই হয় নি। সব ভাইয়া কিনে দিয়েছে, কখনও বলেনি তুই কিনে ফেল।
গাড়ি ছেড়ে দিল। ক্রমশ বাসা থেকে দূরত্ব বাড়ছে, একসময় নিজ শহর পেরিয়ে গেলাম। জুবায়ের হাসান জিহাদ ফোন দিচ্ছে। ময়মনে দেখা করবে সে। জিহাদ আমার কোন আদরের ছোটভাই, যদিও আত্মীয়তার সম্পর্কে কেউ নয়, তবুও সে আত্মার আত্মীয়। আমি ওর স্কুলের অভিভাবকের ভূমিকায় আছি। টুকটাক দিক নির্দেশনা দেই। এতেই সে আমার দারুণ ভক্ত বনে গেছে। এবার জাহাজ থেকে নামার পর লম্বা শুভেচ্ছাপত্র দিয়েছে সে। জাহাজে চলে যাচ্ছি তাই শেষ দেখাটা তার করতেই হবে। জুবলিঘাটের সৌদিয়া কাউন্টারে সে অপেক্ষা করছে। বাস পৌঁছাতেই সে গাড়িতে উঠলো। তার শিক্ষাভাবনা নিয়ে কিছু মত বিনিময় হল, কিছু পরামর্শ দিলাম। বাস ছেড়ে দেওয়ার সময় হয়েছে, জিহাদকে বিদায় জানালাম। গেট দিয়ে নেমে গেল সে। পরক্ষণেই দৌড়ে এলো, ফুপিয়ে কান্না করছে, মাথার টুপি খুলে বলছে ভাইয়া একটু ফুঁ দিয়ে দেন। আমি জরিয়ে ধরে শান্তনা দিলাম। এমন কিছু সত্যিই আমি আশা করি নি। জিহাদ কুরআনের হাফেজ, অনেককেই সে কুরআন পড়িয়েছে, এখনও পড়াচ্ছে। সে আমাকে যে চোখে দেখে আমি নিজেকে তার যোগ্য মনে করিনা। জিহাদ নেমে গেল, বাস চলতে শুরু করলো। পাশের সিটে বসা এক বালক প্রশ্ন করলো ছেলেটা কে হয় আপনার? আমি বললাম আমার ছোটভাই।
পিঠের ব্যথাটা এখনও আছে। উঁচুনিচু রাস্তায় বাস যখন ঝাঁকুনি খায়, তখন আরও বেশি ব্যথা লাগে। নেক পিলোতে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছি। ঘুম আসছে না। রাত তখন আনুমানিক দুইটা বাজে। হঠাৎ করে ব্যথাটা আরও বেড়ে গেল। চোখে ঝাপসা দেখছি। মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে যাব। বাসায় কল দিলে কান্নাকাটি পড়ে যাবে। পাশের ছেলেটিকে বললাম আমার খুব খারাপ লাগছে। তোমার কোলে একটু মাথা রাখি। ছেলেটি সম্মতি দিল। আস্তে আস্তে খারাপ লাগাটা বাড়ছে। ছেলেটিকে আমার মোবাইল দেখিয়ে বললাম, এটা আমার মোবাইল, পাসওয়ার্ড এতো এতো। এতে আমার বড়ভাই, আব্বুর নাম্বার আছে। আমি যদি অজ্ঞান হয়ে যাই, তাহলে কল দিয়ে তাদের একটু জানাবে আর আমার সাথে থাকা ব্যাগটা দেখে রাখবে। এতে আমার জরুরি কাগজপত্র রয়েছে।
কথাগুলো বলে চুপ করে শুয়ে রইলাম। মাঝে শরীর একটু ভালো বোধ করায় দ্রুত কয়েকটা বিস্কুট খেয়ে গ্যাস্ট্রিকের সিরাপ খেয়ে নিলাম।
রাত চারটার দিকে বাস কুমিল্লায় পৌছালো। যাত্রা বিরতি। ছেলেটিকে নিয়েই হোটেলে গেলাম। সামান্য খাবার খেয়ে আবারও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেলাম। শরীর একটু ভালো লাগছে। বাকি পথ টুকু টুকটাক কথাবার্তা বলে পার করে দিলাম। বাস চট্টগ্রামে পৌঁছালো। বিভিন্ন স্টেশনে লোকজন নেমে যাচ্ছে। আমাকে আপাতত হোটেলে ওঠতে হবে। জিসির মোড়ে নেমে যেতে হবে চৌমুহনী। ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো আমি কোথায় যাব। বললাম হোটেলে। সে বলল, ভাইয়া আমার সাথে চলেন। আমি বাসা নিয়ে থাকি হিল ভিউ এলাকায়। আপনার কোন সমস্যা হবেনা। একটু ইতস্তত করে রাজি হয়ে গেলাম। এ অবস্থায় হোটেলে ওঠতে সাহস পাচ্ছিলাম না।
ছেলেটির নাম শফিকুল ইসলাম। বাড়ি মধুপুর গড়ের ভেতর কাঠভোলা এলাকায়। চট্টগ্রাম পলিটেকনিকেলে পড়াশোনা করছে। এ বছরই ভর্তি হয়েছে। অনলাইনে ক্লাস করছে। শফিকুলের বাবা ব্যবসায়ী। সারাদেশেই রাবার সরবরাহ করেন। চট্টগ্রামে আসা যাওয়া করেন। একজন ব্যবসায়ি পার্টনারকে সাথে নিয়ে বাসা নিয়েছেন। শফিকুলরা দুইভাই। মা বেঁচে নেই। শফিক ছোট থাকতেই মাকে হারিয়েছে। বাবা আরেকটি বিয়ে করেছে, তবে কখনও মায়ের অভাব বুঝতে দেন নি।
জিসির মোড়ে বাস থেকে নামলাম। শফিক সিএনজি নিয়েছে। হিল ভিউয়ে যাচ্ছি। শরীর একটু ভালো। বাসায় কল দিয়ে চট্টগ্রামে পৌছানোর কথা জানালাম। শফিকদের ফ্ল্যাটটা অনেক বড়। তিনটি থাকার রুম, সাথে ড্রয়িং ও ডাইনিং। ফ্ল্যাটে কেউ নেই। শফিকের বাবার বন্ধু মাসে সপ্তাহ খানিক পরিবার নিয়ে থাকেন। বাকি সময় শফিক একাই থাকে ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটে পৌছেই দ্রুত ফজরের সালাত পড়ে ঘুমাতে গেলাম, দুই ঘন্টা ঘুমাতে পারবো। সকাল নয়টায় অফিসে যেতে হবে। ঘুম থেকে ওঠেই দেখি শফিক আমার জন্য খাবার রান্না করেছে। রান্নাবান্না সে নিজেই করে। পাক্কা রাধুনি। তাড়াতাড়ি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
জাহাজ কোম্পানির অফিস আগ্রাবাদে৷ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ষষ্ঠ তলায়। ১০ টায় অফিসে পৌছালাম। আমার সাথে যারা সাইন অন করবে তারা সরকারি শিপিং অফিসে গিয়েছে। আমিও সেখানে গেলাম। সাইন অন আর মেডিকেল শেষ করে দুপুর একটায় আবার অফিসে আসলাম ব্রিফিংয়ের জন্য। আমার সাথে সাইন অন করেছে চীফ অফিসার, থার্ড অফিসার, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার ও এক ওএস৷ যোহরের নামাজ শেষে ব্রিফিং রুমে গিয়ে বসলাম সবাই। শরীর খুব দূর্বল লাগছে। রুম থেকে বের হয়ে নামাজের জন্য নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
অনেকক্ষণ শুয়ে রইলাম। হঠাৎ নাবিকদের মেনিংয়ের প্রধান ক্যাপ্টেন স্যারের ডাকে ওঠে বসলাম। উনি চেয়ারে বসা। জিজ্ঞেস করলেন, শরীর এখন কেমন। জাহাজে জয়েন করতে পারবো কিনা। আমি বললাম, আমি দুয়েক দিন পর জয়েন করতে চাই। এর মধ্যে শরীর ভালো না লাগলে জানাবো। স্যার অভয় দিলেন, বললেন সমস্যা নেই। তুমি রেস্ট নাও। একান্তই যদি ওঠতে না পার তাহলে আমাকে জানাবে, অসুস্থ তো মানুষ যেকোন সময়ই হতে পারে। স্যার খুব ভালো মানুষ। জাহাজের সবাই তাকে খুব পছন্দ করে।
দুপুর তিনটায় সবাই ইমিগ্রেশন অফিসে গেলাম। ইমিগ্রেশনের জন্য নির্ধারিত ফি ৫০০ টাকা। এ টাকার এক পয়সাও সরকার পায় না। কারা নেয় সেটা বললে চাকরি থাকবে না। তাই সবাই নিজ দায়িত্বে বুঝে নিন। এবার অবশ্য তিনশো দিয়েছি। একেকজনের কাছ থেকে এক এক ফি। ইমিগ্রেশন শেষ করে নিউ প্যারিস টেইলার্স থেকে বয়লারস্যুট আর সেফটি শু নিলাম। এগুলোর খরচ কোম্পানি বহন করে। সব শেষ করতে বিকাল পাঁচটা বেজে গেল। চীফ অফিসারের সাথে আগ্রাবাদ মোড়ে এলাম রিক্সায় করে। প্রচন্ড মাথাব্যথা করছে। আগ্রাবাদ মোড় থেকে দুজন পৃথক হয়ে গেলাম। হিল ভিউয়ে যাব, কোন খালি সিএনজি পাচ্ছি না। দাঁড়িয়ে থাকতেও খুব কষ্ট হচ্ছে। রিক্সায় করে চৌমুহনীতে আসলাম। এখানেও সিএনজি নেই। মাথাব্যথায় পড়ে যাব এমন অবস্থা। অনুমতি নিয়ে এক দোকানের সামনে রাখা টুলে বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরপর দুয়েকটা সিএনজি আসে, তবে কেউ হিল ভিউয়ে যেতে রাজি হলো না। অবশেষে একজন রাজি হলো। দ্রুত তার সিএনজিতে ওঠে বসলাম। শুয়ে পড়লাম সিটে। সিএনজি চৌমুহনী মোড়ে জ্যামে পড়েছে। হঠাৎ করে খেয়াল হলো আমার কাগজপত্র রাখা ব্যাগটা সাথে নেই। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে দোকানে ফেলে এসেছি। সিএনজি থেকে নেমে দোকানে গেলাম। ব্যাগটা পাওয়া গিয়েছে সাথে দোকানির সামান্য ভর্ৎসনা। সিএনজি চলছে। আমি বয়লারস্যুট রাখা ব্যাগটাকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে আছি। বমি বমি লাগছে। ড্রাইভারকে বলতে বলতেই গেট খুলে বমি করে দিলাম। বমি করার পর একটু ভালোবোধ হলো। চট্রগ্রামের পটিয়ায় আমার খালা শ্বশুরবাড়ি। ইতোমধ্যেই তারা আমার অসুস্থতার খবর জেনে গেছে। একের পর এক কল দিচ্ছে। কল রিসিভ করে বললাম, আমার শরীর ভালো না। এ অবস্থায় এতদূর যেতে সাহস পাচ্ছি না। আগামীকাল সকালে যাব। খালু বলল তিনি এসে নিয়ে যাবেন আমাকে।
সন্ধ্যায় হিল ভিউয়ে পৌছালাম। শফিক নিচে অপেক্ষা করছে আমার জন্য। কিছু সবজি আর ফলমূল কিনলাম বাসার জন্য। বাসায় গিয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে ওঠে দেখি রাত প্রায় দশটা বাজে। শফিক আমার জন্য খাবার রান্না করে বসে আছে।
রাতে ভালো ঘুম হলো। পিঠের ব্যথা কমে গেছে। বড়খালু সকাল দশটায় এসে হাজির। আমাকে নিয়ে যাবে। শফিকের কাছে লাগেজ রেখে বড়খালুর সাথে শান্তির হাটের দিকে যাত্রা করলাম। বড়খালুদের বাসা শান্তিরহাটের অদূরে হরিণখাইন এলাকায়। কিছুদিন আগে উনার বড় ছেলের বিয়েতে এসেছিলাম। খালুর বড়ভাইকে সবাই বড় আব্বা বলে ডাকে। হেফাজতের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী ভাইয়ের বাবা। আমাকে অন্যদের থেকে অনেক বেশি মহব্বত করেন। যে কয়দিন ছিলাম, খাবার সময় আমাকে সাথে নিয়ে খেয়েছেন। এর পেছনে যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি উনি আমার শ্রদ্ধেয় শ্বশুর। আব্বু ২০১১ সালে পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। পুরো নাবাতাতি গোষ্ঠীকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন তিনি। সকলের বিপদে আপদে সবার আগে এগিয়ে গিয়েছেন। উনাকে দেখিনি। তবে উনার এত বেশি প্রসংশা শুনেছি যা সত্যিই বিস্ময়কর। বড় আব্বু বিয়ের চারদিন সময়ে অসংখ্যবার আব্বুর কথা বলেছেন। উনি বলেছেন, ইকবাল ভাইয়ের এহসান ভুলার মতো নয়। উনার কথা শুনে আমার চোখ ভিজে গিয়েছে। কত মহান একজন মানুষ ছিলেন তিনি। আল্লাহ উনাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন।
জুমার নামাজ শান্তিরহাটে আদায় করে খালুদের বাসায় পৌছালাম। বড়আব্বু আমার জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছেন। দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমালাম কিছুক্ষণ। রাতেও বড়আব্বুর সাথে খেলাম। পরদিন জাহাজে ওঠবো, তাই এশার নামাজের পরপরই আবার ঘুমিয়ে গেলাম৷ সকালে ঘুম থেকে ওঠে পিঠের ব্যথাটা অনুভব করলাম না। শরীর বেশ জরজরে লাগছিলো। সবাই আজ নতুন বউদের বাসায় যাবে বউকে আনতে। খালুকে বললাম আমি একাই যেতে পারবো। খালু কোনভাবেই রাজি না। উনি আমার সাথে যাবেন। বড়আব্বুও একা ছাড়বেন না। এগারটার দিকে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওয়ানা করলাম। বড়আব্বু হাদিয়া দিলেন। দুপুরে শফিকদের বাসায় পৌছালাম। আমি আসছি শুনে শফিক মুরগির গোস্ত রান্না করেছে। হাতে সময় নেই। তবুও ছোটভাইটার আবদার রাখতে অল্প খেলাম। শফিক বাসার নিচ পর্যন্ত এলো। চেনে নেই জানা নেই এমন একজনের জন্য শফিক যা করেছে তা ভুলার নয়। শফিককে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি কেন আমাকে বাসায় নিয়ে এলে। তার সহজ উত্তর বিপদগ্রস্ত কাউকে আমি একা ফেলে আসতে পারি না। শফিককে জরিয়ে ধরে বিদায় নিলাম। ইনশা আল্লাহ আবার দেখা হবে আমাদের।
বড়খালুকে চট্টগ্রামের টাইগার পাসে একরকম জোর করেই নামিয়ে দিলাম। সী বীচ থেকে শান্তির হাট অনেক পথ। খালুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছুটে চললাম নীল সমুদ্রের পানে। হাতছানি দিয়ে ডাকছে নীল প্রেয়সী আমার। আমার সহধর্মিণীর একমাত্র সতীন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button