বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ১ আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

গল্প: অভিমানের ঝুলি

মাহমুদা তুহিন | ১৬ মার্চ ২০১৮ | ১২:১৮ অপরাহ্ন

গল্প: অভিমানের ঝুলি

ফরমালিনের কড়া গন্ধে আমার কেমন যেন মাথা ঘুরছে। যদিও অনেকদিন ধরে আমি এ কাজের সাথে জড়িত, মোটামোটি দেড় বছর ধরে বিভিন্ন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে হিউম্যান এনাটমি পড়াচ্ছি ভবিষ্যত ডাক্তারদের। ফরমালিনে ভেজানো মানব দেহ থেকে ই বিভিন্ন অর্গান গুলোর সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিই। গত কিছুদিন অর্থাৎ তিন-চার দিন আগেই এই মেডিকেলে জয়েন করলাম। আজ ছেলে-মেয়েদের হিউম্যান এনাটমি পড়াব বলে চলে আসলাম একটি মানব দেহ যেখানে ফরমালিনে সংরক্ষিত থাকে সেখানে। রুমের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতে গিয়ে ই ফরমালিনের কড়া গন্ধে মাথা ধরেছে। এতদিন ধরে এ কাজ করে ও আমি অব্যস্ত হতে পারলাম না। যাহোক ছেলে-মেয়েদের নিয়ে এগিয়ে গেলাম ফরমালিনে সংরক্ষণ করা মানব দেহটির সামনে। তাদের আজ তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেব। তবে আমিও। কেননা তাকে তো এখন ই আসলাম কেবল দেখতে। মানব দেহটির রুক্ষ অথচ সতেজ মুখটি দেখে কেমন যেন থমকে দাঁড়ালাম। কীভাবে শুরু করব! কি বলব! আমার মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললাম। পুরনো স্মৃতিগুলো হৃদয় স্পটে বিচরণ করছে। তখন কেবল ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলাম এক বুক স্বপ্ন নিয়ে, ডাক্তার হব বলে। অচেনা – অজানা একটা পরিবেশে খুব একা একা লাগত। তাই ক্লাসের সময়টুকু বাদে প্রায় সারাক্ষণ ই লাইব্রেরিতে বসে পড়তাম। ইচ্ছে, এক চান্সে ই প্রফে পাশ। পড়তে গিয়ে অনিহা সৃষ্টি হয়নি। শুনেছি অনেকেই মেডিকেলের পড়ার চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। কিন্তু সত্যি বলতে কি আমার খুব ভালো ই লাগত। লাইব্রেরিতে পড়তে গিয়ে পরিচয় হল সেকেন্ড প্রফে পরীক্ষা দেবে এমন এক সিনিয়ারের সাথে। তিনি খুব মেধাবী, তা বুঝতে আমার খুব সময় লাগল না। কোন কিছু বুঝতে সমস্যা হলে তার কাছে বললেই সমস্যার সমাধান। তপু সেকেন্ড প্রফে পাশ করে ফেলল। ততদিনে সে আমার খুব কাছের বন্ধু। যাকে ছাড়া এক সেকেন্ডও চিন্তা করা যায় না এমন। খতা-পত্রে আঁকা-আঁকি তে সে আমার প্রতি কৃপণতা করে নি। খুব ভালো ই চলছিল। ইতোঃমধ্যে ওয়ার্ড ডিউটি শুরু হল তার। আজএই ওয়ার্ড কাল সে ওয়ার্ড। শেষমেশ সে থার্ড প্রফে বসার জন্য নিজেকে উপযুক্ত করে নিল।

কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম সে নাকি পরীক্ষা দেবে না। তার কারণ সে আমাকে বলে নি। অথচ আমার অজানা থাকে না। কারণ তার ফরম ফিলাপের টাকাটুকু যোগাড় হয়নি। আমি এটাও জানতে পারি, সে নাকি বিভিন্ন হাসপাতালে নাইট অর্থাৎ ওয়ার্ড বয়ের কাজ করেই পড়াশোনার খরচ চালাতো। পৃথিবীতে নাকি তার আপন বলতে তেমন কেউই নেই। আমি তাকে ফরম ফিলাপের টাকা টা দিতে চাইলে সে খুব আপত্তি জানায়। পরে অবশ্য ধার হিসেবে দিলাম। তার পরীক্ষা শুরুর আগেই তাকে কিছু কেনাকাটা করে দিলাম।যদিও সে নিতে খুব আপত্তি করেছিল। এতদিনে আমরা একজন অন্যজনকে মন দিয়ে দিয়েছি। বিষয়টি ভালো লাগেনি কলেজের নেতা প্রকৃতির ছেলেটির। সে নেতা প্রায়শই তাকে গুম করে ফেলার হুমকি ও দিয়েছে। আমার প্রভাবশালী বাবা-ভাই তপুকে কতটুকু মেনে নিবে তা যাচাই করার প্রয়োজন মনে করিনি। তবে নেতা প্রকৃতির ছেলেটি নেয়নি। খুব সম্ভবত জুন মাসের শেষে তপুর রেজাল্ট বের হল এবং পাশ ও করল। খুশিতে কুটিকুটি আমরা। ইন্টার্নি শুরুর আগেই আমরা কাজী অফিসে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার বন্ধুমহল, তপুর বন্ধুমহল কারো আর জানার বাকি রইল না। সবাই খুব খুশি ই বলতে গেলে। একদিন নিউমার্কেটে গিয়ে সেই দিনটির জন্য কিছু পোশাক ও কিনে নিলাম। অবশেষে কবে কাজী অফিসে যাচ্ছি তার তারিখ ও সময় ঠিক করলাম। দিনটি ছিল সোমবার। খোশ মেজাজে বের হলাম কাজী অফিসের উদ্দেশ্যে। যথাসময়ের তিন ঘন্টা তেইশ মিনিট পরও সে আসে নি। যেহেতু তখন মোবাইল ফোনের যুগ ছিল না তাই তার গতিবিধি জানার উপায় ছিল না। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ও তার দেখা সেদিন পাওয়া গেল না। ফিরে এসে অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো খোঁজ বের করতে পারলাম না। চলে আসল সেকেন্ড প্রফ। পরীক্ষা দেবার অনুমতি আমি পেলাম না। কারন টার্ম, কার্ড, আইটেম সবই পেইন্ডিং ছিল। না তপুকে খোঁজে পাওয়া গেল না। কলেজের কেউ ই তার খোঁজ দিতে পারল না। চলতে থাকল সময়। কিন্তু একদিনে একজন মানুষ কীভাবে হারিয়ে যায়?? নিজেকে ঠিক করতে অনেক সময় লাগল। সময় বেশি লাগলেও একটা সময় আমি ঠিক ই ডাক্তার হলাম। তপু পাশে থাকলে হয়তো ডাক্তার হওয়াটা এত কঠিন হতো না। কিন্তু কয়েক হাজার দিন পরে ও তাকে পাওয়া গেল না। এমনকি বিএমএ তে ও তার খোঁজ পেলাম না। মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে ভাবতাম কী এমন দোষ ছিল আমার!!


আজ এত বছর পর একটা প্রাইভেট মেডিকেলে ফরমালিনে সংরক্ষিত তপুকে দেখতে হবে, তা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করি নি। হঠাৎ করে চিৎকার শুনতে পেলাম। আমার স্মৃতি চারণের সমাপ্তি ঘটল যখন দেখলাম ফরমালিনের কড়া গন্ধে একজন, অন্যজনের গায়ে বমি ই করে দিল। অভিমানের ঝুলিটা নিমিষেই শুন্য হয়ে ক্রমান্বয়ে বেড়ে ই চলতে থাকল দুঃখ নামক শব্দটির পরিসর।


বাংলাদেশ সময়: ১২:১৮ অপরাহ্ন | শুক্রবার, ১৬ মার্চ ২০১৮

প্রবাসীকালডটকম | প্রবাসে দেশের প্রতিচ্ছবি |

advertisement

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

৩০ নভেম্বর ২০১৬

০১ ডিসেম্বর ২০১৬

১১ ডিসেম্বর ২০১৬

১৪ ডিসেম্বর ২০১৬

১৭ ডিসেম্বর ২০১৬

১৭ ডিসেম্বর ২০১৬

২৫ ডিসেম্বর ২০১৬

২৭ জানুয়ারী ২০১৭

০১ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

০৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

১৩ মার্চ ২০১৭

advertisement
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
advertisement

সম্পাদক : যাকারিয়্যা মাহমূদ

নির্বাহী সম্পাদক : শাহাদাত হুসাইন

বার্তা সম্পাদক : এস এ রুবেল


phone : +966534923608, +966551957380, +8801912-392439 | E-mail : newsprobasikal@gmail.com, editorprobasikal@gmail.com

©- 2020 প্রবাসীকালডটকম | প্রবাসে দেশের প্রতিচ্ছবি all right reserved