বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ১ আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম

কীর্তিমান এক মহিয়সী নারী উম্মে আম্মারাহ্ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা)

আফরিনা সুলতানা | ২৭ আগস্ট ২০১৭ | ৩:৪২ অপরাহ্ন

কীর্তিমান এক মহিয়সী নারী উম্মে আম্মারাহ্ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা)

সম্মানিত পাঠক/পাঠিকা, আপনার সামনে আজ এমন একজন মহিয়সী মায়ের ঈমানদীপ্ত কাহিনী পেশ করছি, যিনি একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও কুফরের বিরুদ্ধে সংগঠিত ইসলামের অনেক যুদ্ধে অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর পাশাপাশি তাঁর ছেলেরাও ইসলামের জন্য ধৈর্য্য ও অটল এক নজিরহিবীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

এ মহিয়সী নারী হলেন, প্রসিদ্ধ নারী সাহাবী উম্মে আম্মারাহ্ নুসাইবাহ্ বিন্তে কা‘ব (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা), যার সুযোগ্য ছেলে হযরত হাবীব বিন যাইদ আল আনছারী (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিথ্যা নুবুওয়্যতের দাবীদার মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের নিকট সত্যের পয়গাম নিয়ে পাঠিয়েছিলেন। মুসাইলামা তাঁকে তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আদেশ দিলো, কিন্তু তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তার এই আদেশ প্রত্যাখ্যান করে সাফ জানিয়ে দিলেন, তিনি তাকে নবী মানেন না। ফলে মুসাইলামাহ্ তাঁর উপর এমনভাবে শাস্তি ও নির্যাতনের স্টিমরোলার চালাতে লাগলো যা শুধু একজন খাঁটি ঈমানদারের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব।


নির্যাতনের সময় মুসাইলামাহ্ ও তাঁর মধ্যকার নিম্নের কথোপকথন হয়:

মুসাইলামাহ্: তুমি কি আমাকে আল্লাহ্’র রাসূল হিসেবে স্বাক্ষ্য দাও?।
হাবীব বিন যাইদ: আমি তোমার কথা শুনছি না। (সুবহানাল্লাহ! এটাই হলো খাঁটি ঈমান)।
মুসাইলামাহ্: তুমি কি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহ্’র রাসূূল হিসেবে স্বাক্ষ্য দাও?।
হাবীব বিন যাইদ: হ্যাঁ, আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি আল্লাহ্’র রাসূল।


মুসাইলামাহ্ হাবীব বিন যাইদ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র কাছে একই প্রশ্নগুলো আবার করলে তিনি একই উত্তর দেন। এতে মুসাইলামাহ্ রাগে-ক্ষোভে বললো: তোমাকে যখন আমার কথা বলি তখন তুমি কথা শুনতে পাওনা। আর যখন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)’র কথা বলি তখন বলো: হ্যাঁ, আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি আল্লাহ’র রাসূল। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে গর্জে উঠলো: হাবীবের শরীরকে আমার সামনে কেটে টুকরো টুকরো করা হোক। জল্লাদ কাটা শুরু করলো। মুসাইলামাহ্ বললো: এখনো ফিরে আসতে পারো, প্রাণে বেঁচে যাবে। কিন্তু হাবীব (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু) জীবন-মরণের এই সন্ধিক্ষণেও ঈমানের উপর হিমালয়ের ন্যায় অটল থেকে বললেন: ‘এটা তো শুধু একটি জীবন। এ ধরণের হাজারো জীবন পেলেও তা ইসলামের জন্য হাঁসিমুখে উৎসর্গ করে দিতে সামান্যতমও কোন্ঠাবোধ করবো না’। এভাবে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হলো, কিন্তু তার মুখ থেকে এক মুহুর্তের জন্যও “লা-ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ” এর জিকির বন্ধ হয়নি।

প্রিয় পাঠক/পাঠিকা, এ ধরণের পরিস্থিতিতে ধৈর্য্যধারনকারীদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন: “যারা বলে: আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ্ তা‘আলা এবং (এ কথার উপর) অবিচল থাকে (যদিও তাদের শরীরকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়), তাদের উপর আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে রহমতের ফেরেশ্তা অবতরণ করে (এ সুসংবাদ দেয় যে), তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তিতও হয়ো না এবং তোমরা জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হতো”।


ইসলামের চরম দুশমন, অহংকারী ও জালিম মুসাইলামাহ্’র অবর্ণনীয় জুলুম ও নির্যাতন হযরত হাবীব বিন যাইদ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কে খতমে নুবুওয়্যতের আক্বীদাহ্ থেকে বিন্দু পরিমাণও টলাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তিনি শাহাদাত বরণ করেন। কিয়ামত পর্যন্ত আগত তাঁর উত্তরসূরীদের জন্য এ সবক দিয়ে গেলেন: খতমে নুবুওয়্যতের আক্বীদা রক্ষার জন্য প্রয়োজনে জান কুরবান করে দিতে হবে।

হযরত হাবীব (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র মা উম্মে আম্মারাহ্ নুসাইবাহ্ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা) অনন্যসাধারণ একজন মহিয়সী নারী ছিলেন। উহুদ যুদ্ধে যারা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর প্রতিক্ষার দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের পেছনে পেছনে ছিলেন উম্মে আম্মারাহ্ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা)। লড়াই করতে করতে তিনি হঠাৎ ইবনে কামআ নামক কাফিরের সামনে পড়ে গেলে তাঁকে সে তরবারীর আঘাত করলো, এতে তিনি গুরুতর আহত হন। তিনিও ইবনে কামআকে কয়েকবার তরবারীর আঘাত করেছেলন, কিন্তু সে বর্ম পরিহিত থাকায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। তিনি সেদিন বারো বার আঘাতপ্রাপ্ত হন।

এই মহিয়সী নারীর কাছে যখন নিজের গর্ভজাত ছেলে হযরত হাবীবের শাহাদাতের খবর পৌঁছলো, তখন তিনি না কাঁদলেন, না চিৎকার করলেন, বরং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে বললেন: “এ ধরণের পরিস্থিতির জন্যই তো আমি তাকে তৈরি করেছি, সুতরাং এর জন্য আমি আল্লাহ্’র কাছে প্রতিদানের আশা করি।”

মুহতারাম পাঠক/পাঠিকা, উম্মে আম্মারাহ্ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা) মুসাইলামার পক্ষ থেকে তাঁর ছেলের উপর চলা জুলুম ও নির্যাতনের কথা কখনো ভুলতে পারেননি। যখন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের বিরুদ্ধে সংগঠিত ইয়ামামার যুদ্ধের দিকে রওয়ানা হলো তখন উম্মে আম্মারাহ্ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর দ্বিতীয় ছেলে আব্দুল্লাহ বিন যাইদের সাথে তিনিও গেলেন। উদ্দেশ্য হলো: যেন তাঁর প্রথম ছেলে হাবীবের খুনীর অসহায় পরিণাম স্বচক্ষে দেখতে পান। মুসাইলামাহ্ ও মুসলমানদের মাঝে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংগঠিত হয়। শেষ পর্যন্ত মিথ্যা নুবুওয়্যতের দাবীদার বনু হানিফার সর্দার মুসাইলামাতুল কাজ্জাব সাহাবায়ে কিরামের হাতে নির্মমভাবে নিহত হলো। ইয়ামামার এই কঠিন যুদ্ধে উম্মে আম্মারাহ্ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা) নিজেও বিরত্বের সাথে লড়াই করে গুরুতর আহত হন। তাঁর এক হাত কাটা পড়ে। খালেদ বিন ওয়ালিদ (র.)’র কাছে এ খবর পৌঁছলে চিকিৎসার জন্য একজন ডাক্তার পাঠালেন। ডাক্তার তাঁর হাত ফুটন্ত তেলে ছ্যাঁকে চিকিৎসা করলেন। পরে প্রায় একবছর পর ওমর (রদ্বিয়াল্লাহু আনহু)’র আমলে ইসলামের এই মহান নারী সেই আঘাতের প্রভাবে ইন্তিকাল করেন। তাঁকে মদীনার বাকী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আল্লাহ্ তা‘আলা ইসলামের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গকারী এই মহান নারীর উপর সন্তুষ্ট হোন। আমীন।

ঈমানদীপ্ত এ কাহিনী আমাদেরকে যা শিক্ষা দেয়:
– একজন মুমিনের জীবনে ঈমানের চেয়ে দামী ও গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো বস্তু নেই। ঈমানের তাগিদে প্রয়োজনে আল্লাহ্’র রাস্তায় নিজের জান-মাল সর্বস্ব উৎসর্গ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সকলে সমান।

– ঈমান-আক্বীদা রক্ষায় কঠিন থেকে কঠিনতর মুছিবত ধৈর্য্য ও অবিচলতার সাথে মোকাবিলা করা বাঞ্ছনীয়।

– উম্মে আম্মারাহর মধ্যে একজন আদর্শ মায়ের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠৈ। নিজে ঈমানী শক্তিতে বলিয়ান হওয়ার পাশাপাশি নিজ সন্তাদেরকেও এমনভাবে গঠন করেন, যেন তারা আল্লাহ্’র রাস্তায় সম্মুখীন হওয়া যেকোনো পরিস্থিতি ধৈর্য্য ও অবিচলতার সাথে মোকাবিলা করতে পারেন। মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের হাতে তাঁর প্রথম ছেলে হাবীবের মৃত্যু-সংবাদ শোনার পর তাঁর অনুভূতি “এ ধরণের পরিস্থিতির জন্যই তো আমি তাকে তৈরি করেছি, সুতরাং এর জন্য আমি আল্লাহ্’র কাছে প্রতিদানের আশা করি” আমাদেরকে এ কথা শিক্ষা দেয়, সন্তানের ভবিষ্যত বিনির্মাণে মায়ের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।

পরিশেষে সম্মানিত পাঠক/পাঠিকা,উম্মে আম্মারাহ্ (রদ্বিয়াল্লাহু আনহা)’র ঈমানদীপ্ত এ কাহিনীতে আমাদের জীবনের জন্য অনেক খোরাক রয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফীক্ব দান করুন।

লেখিকাঃ আফরিনা সুলতানা

বাংলাদেশ সময়: ৩:৪২ অপরাহ্ন | রবিবার, ২৭ আগস্ট ২০১৭

প্রবাসীকালডটকম | প্রবাসে দেশের প্রতিচ্ছবি |

advertisement
advertisement
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
advertisement

সম্পাদক : যাকারিয়্যা মাহমূদ

নির্বাহী সম্পাদক : শাহাদাত হুসাইন

বার্তা সম্পাদক : এস এ রুবেল


phone : +966534923608, +966551957380, +8801912-392439 | E-mail : newsprobasikal@gmail.com, editorprobasikal@gmail.com

©- 2020 প্রবাসীকালডটকম | প্রবাসে দেশের প্রতিচ্ছবি all right reserved