ইসলামনারী অঙ্গনব্রেকিংসাহিত্য-সংস্কৃতিস্লাইডার

আমার প্রথম হজ্ব: কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভূতি

হজ্ব ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম স্তম্ভ। আল্লাহ্’র নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দার মধ্যকার সম্পর্কের একটি সেতুবন্ধন। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিম নারী-পুরুষের উপর আল্লাহ্ তা’আলা হজ্ব ফরজ করেছেন। প্রতি বছর গুরুত্বপূর্ণ এ বিধান আদায়ে আল্লাহ্’র ঘর অভিমুখে ছুটে আসে বিশ্বের নানা প্রান্তের লক্ষ লক্ষ মুসলিম। যে পবিত্র ঘর প্রতিটি মুমিনের প্রাণের স্পন্দন, হৃদয়ের আকর্ষণ। আর এ আকর্ষণের মর্ম তখনই বুঝতে পারি, যখন আল্লাহ্ তা’আলা ১৪৩৫ হিজরী সনে আমাকে হজ্ব আদায় করার তাওফীক্ব দান করেন।

সম্মানিত পাঠক/পাঠিকা! যখন থেকে হজ্ব ও পবিত্র বাইতুল্লাহ্’র মর্যাদা সম্পর্কে জানি, তখন থেকেই অন্যান্য মুসলিমের মতো স্বপ্ন দেখতাম ইসলামের অন্যতম এ বিধান আদায়ের। আমার প্রিয়তম জীবনসাথী রাসূলের প্রিয় শহর মদীনায় অবস্থানের ফলে আল্লাহ্ তা’আলার খাছ রহমত ও তাওফীক্ব অতঃপর আমার প্রিয়তমের আন্তরিক সহযোগিতায় আমারও মদীনা যাওয়ার সুযোগ হয় – আল হামদু লিল্লাহ- ১৪৩৫ হিজরীর শা’বান মাসে।

আল্লাহ্’র ঘরের এত কাছে আসার পর দীর্ঘদিনের সে লালিত স্বপ্ন পূরণে বিলম্ব করা অপরাধ মনে হচ্ছিলো। আমার আব্বা-আম্মা সে বছর হজ্ব করতে আসায় আমার আগ্রহে যেন জোয়ার আসলো। সবচেয়ে আপন মানুষগুলোর সাথে এ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতটি করার সুযোগ কি কেউ মিস করতে চায়! তাই, শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও আমার প্রিয় মানুষকে আমার প্রিয় ইচ্ছার কথা জানালাম। তিনিও রাজি হয়ে বললেন: যেভাবেই হোক তোমাকে এ বছর হজ্বে নিয়ে যাবো -ইনশা আল্লাহ্-।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জিলহজ্বের আট তারিখ “লাব্বাইক” বলে আল্লাহ্”র ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁরই পবিত্র ঘরের দিকে রওয়ানা দিলাম।

জীবনের প্রথম হজ্ব পালন করতে যাচ্ছি, তা ভাবতেই মনের মধ্যে কি যে অনাবিল সুখ-শান্তি অনুভূত হচ্ছিলো, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হজ্বের নিয়তে মদীনাবাসীর জন্য রাসূল (সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)’র নির্ধারণ করে দেওয়া মীক্বাত “জুল হুলাইফা” থেকে ইহরাম করে যখন বাইতুল্লাহ শরীফের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম তখন নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যেন স্বপ্ন দেখছি। ৪ ই জিলহজ্ব রাতে তওয়াফে কুদূম (আগমনী তওয়াফ)’র পর মিনা হয়ে যখন ৯ ই জিলহজ্ব আরাফার ময়দানের উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম তখন প্রচন্ড গরম পড়ছিলো, কিন্তু মনেপ্রাণে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের আনন্দ ও আত্মতৃপ্তির যে শিহরণ খেলে যাচ্ছিল তার সামনে সে প্রচন্ড তাপদাহ তুচ্ছ মনে হচ্ছিল।

তবে প্রচন্ড গরমের পাশাপাশি অতুলনীয় ভিড়ের কারণে কিছুটা সমস্যায় পড়েছিলাম। ধাক্কাধাক্কিতে কয়েকবার পড়ে গেলেও আল্লাহ্ তা’আলার অশেষ মেহেরবানী অতঃপর আমার প্রিয় মানুষটির অকৃত্রিম ভালোবাসাপূর্ণ সহযোগিতায় উঠতে পেরেছিলাম। তখন মনে বারবার একটি বিষয় দোলা দিচ্ছিলো, হজ্বের সব করণীয় শেষ করতে পারবো কি? দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পুরোপুরিভাবে পূর্ণ হবে কি?। কিন্তু আল্লাহ’র অশেষ মেহেরবানী ও খাছ রহমতে যখন শেষ পর্যন্ত হজ্বের প্রত্যেকটি কাজ যথাযথ ও সুন্দরভাবে পালন করে বিদায়ী তওয়াফের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে হজ্ব আদায় পরিপূর্ণ করতে পারলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমার মতো এত সৌভাগ্যবতী দুনিয়ায় আর নেই। আর এ ক্ষেত্রে আমার প্রিয় মানুষটি কতটুকু কষ্ট সহ্য করেছেন তা এখানে উল্লেখ করে তাকে ছোট করতে চাই না। শুধু এটুকুই বলবো: শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আল্লাহ’র খাছ রহমতের পর তার সহযোগিতা ছাড়া হজ্বের কোনো কাজ আদায় করা আমার পক্ষে কস্মিনকালেও সম্ভব ছিলো না।

সুতরাং সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার জন্য, যিনি হজ্বের মতো এ কঠিন ইবাদাতটি আমাকে যৌবনেই আদায় করার তাওফীক্ব দান করেছেন। অতঃপর শুকরিয়া তারও, যার কারণে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি বছর রাসূলের প্রিয় শহরে থেকে হজ্ব ও ওমরাহ্’র উদ্দেশে আল্লাহ্’র পবিত্র ঘরে বারবার হাজিরা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। আমার প্রতি যার সামান্যতম ইহসানও আছে আল্লাহ্ তা’আলা তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

পরিশেষে, আল্লাহ’র কাছে কায়মনোবাক্যে দো’আ করছি, তিনি যেন আমাদের সকলের হজ্বকে “হজ্বে মাবরূর” হিসেবে কবুল করেন এবং তাঁর ঘরে বারবার হাজিরা দেওয়ার তাওফীক্ব দান করেন। আরো দো’আ করছি, যেন আমার কাছের-দূরের আত্মীয়স্বজনসহ সকল মুসলিম নারী-পুরুষকে মৃত্যুর আগে হজ্ব করার তাওফীক্ব দান করেন। কবুল করো ইয়া আল্লাহ্।

লেখিকাঃ আফরিনা সুলতানা

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরও দেখুন...

Close
Close