প্রবাসের গল্পব্রেকিংস্লাইডার

স্মৃতির আরশিতে মেজো ভাই

জীবন চলার পথে প্রতিটি মানুষেরই কিছু না কিছু স্মৃতি থেকে যায়।হোক তা সুখের কিংবা দুঃখের।এসব স্মৃতিগুলো কখনো মানুষকে হাসায়,আবার কখনো চোখের জলে ভাসায়।তবুও মানুষ বেঁচে থাকে বুকভরা স্বপ্ন আশায়।তেমনই কিছু স্মৃতির কথা স্বরণ করে আমি হারিয়ে গেলাম শৈশবের সেই সোনালী দিনগুলোতে।একে একে স্মৃতির আরশিতে ভাসতে থাকলো কতো রকম ছবি।আমি একা একা নীরবে ভাবছি।আর এগিয়ে যাচ্ছি স্মৃতির শহরে অলিগলি পথ ধরে।কতো সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্না,আনন্দ-বেদনার স্মৃতি।যেন তার কোন শেষ নেই।আমি গভীর ধ্যানে একের পর এক স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে যাচ্ছি।
হঠাৎ এক জায়গায় গিয়ে আমার দৃষ্টি থেমে গেল।আমি আর কোন ভাবেই সামনে এগুতে পারছি না।হৃদয়ে কষ্টের ঢেউ খেলা শুরু করে দিলো।সাথে একঝাঁপটা দুঃখের বাতাস সেই ঢেউয়ের গতিটা আরো বাড়িয়ে দিলো।কোন ভাবেই আমি নিজেকে সামাল দিতে পারছি না।শুধু নীরবে নিভৃত্বে একা একা ছটপট করছি।সেই ঢেউয়ে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কান্নার সুর।এক সময় সেই কান্নারা দু’চোখের নদীতে অশ্রুর বন্যা বইতে শুরু করে দিলো।এবার আমি নিজেকে সামাল দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছি।দূর আকাশের নীল সীমানায় তাকিয়ে,ব্যথিত মনে আমার মেজো ভাইয়ের রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো স্বরণ করে আমি নিজেকে কোন ভাবেই সামাল দিতে পারছি না।
:
আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়া প্রাণচঞ্চল এক শিশু।আমার মেজো ভাই মোহাঃ আতিকুর রহমান (দুলাল) ক্লাস এইটে পড়ে।তিনি ছিলেন খুবই নম্রভদ্র সহজ সরল সাদাসিদে নরম মনের ঠান্ডা মেজাজের কিশোর।পরিবার থেকে শুরু করে সবার সাথে সদা হাসি খুশি থাকতে পছন্দজ করেতেন।পরিবার সমাজ থেকে শুরু করে স্কুলের স্কুলের ছাত্র শিক্ষক সবার মাঝে তিনি ছিলেন খুবই প্রিয়।শিক্ষকরাও তাকে ভীষণভাবে ভালোবাসত,ন্সেহ করতো।কারন তিনি লেখা পড়া থেকে শুরু করে স্বভাব চরিত্রেও ছিলেন অনন্য।মোটকথা বর্তমান সমাজে আমাদের মাঝে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বড়ই দুষ্কর বটে।
:
তখন আমাদের পরিবারে আমিই ছিলাম মা-বাবার ছোট ছেলে।মেজো ভাই আমাকে ভীষণ ভালোবাসতো,ন্সেহ করতো।সময় অসমে আমাকে কাছে ঢেকে কতো রকম মজার মজার গল্প শুনাত।আমার স্কুলের পড়াগুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতো।আমাকে কখনো কোনদিন ধমক দিয়ে কথা বলতো না।আদর সোহাগ হাসি আনন্দে ভরিয়ে রাখতো আমাকে।আমার বড় ভাই আজিজুর রহমান বাদল তখন নানার বাড়িতে থেকে লেখা পড়া করত।বাড়িতে ছিলাম আমরা তিন ভাই এক বোন।ঝর্ণা আপু পরিবারের সবার বড়।আর সেজো ভাই মুখলেসুর রহমান হেলাল তিনিও ছিলেন খুব রসিক মনের সদালাপি।
তথাপি মেজো আর সেজো ভাইয়ের মাঝে রাতে পড়ার টেবিলে বসে সামান্য বিষয় নিয়েই লেগে যেতো ভাইয়ে ভাইয়ে কথার কাটাকাটি।আর তখন মা এসে হাসিমুখে বুঝিয়ে শুনিয়ে তাদের মধুর ঝগড়া মিটিয়ে দিতো।ঝগড়া মিটতে দেরি কিন্তু পড়া রেখে তারা দু’জনে চুপি চুপি গল্পে মেতে উঠতে দেরি করতো না।জোরে কথা বললে মা যদি শুনে বকাঝকা করে।
ছেলেদের এসব কান্ড দেখে কখনো কখনো মা রাশিদা আক্তার একা একা মুসকি হাসতেন।অবশ্য আমার বাবা আমিনুল হক মাষ্টার,তিনি বাড়িতে থাকলে ঝগড়া তো দূরের কথা লেখা পড়া ছাড়া টু শব্দটিও করার সাহস পেতো না।কারন বাবা কোন প্রকার দুষ্টোমি পছন্দ করতেন না।
:
চানাচুর বাদম মেজো ভাইয়ের খুবই পছন্দ ছিল।প্রায় দিনই স্কুল থেকে এসে বিকেলবেলা আমার হাতে টাকা দিয়ে বাড়ির অদূরই খোকন দাদার দোখান থেকে বাদাম বা চানচুর আনতে পাঠাইত।যদি কোনদিন কোন কারণে আমি দোখানে যেতে মানা করতাম।আর অমনি আদরেন মাত্রাটা বাড়িয়ে দিয়ে এমনভাবে মিষ্টি সুরে বলতো যে,তখন আর দোকানে না গিয়ে থাকতে পারতামনা।দোকান থেকে আসার পর আমাকে নিয়ে বাড়ির পাশেই খোলা মাঠের নিচে বসে বাদাম খেতো আর আমাকে নানান রকম কিচ্ছা কাহিনি শুনাত।আমিও চুপচাপ গভীর মনোযোগের সাথে শুনতাম।আজ আমার সেই মেজো ভায়ের স্মৃতিগুলো বারবার স্বরণ হতে লাগলো।সেই আনন্দ হাসির পরিবর্তে অশ্রুজলে ভাসাতে লাগলো।
:
মেজো ভাই ছিল একজন সত নিষ্ঠাবান ধার্মিক।শান্ত মনের মানুষ।অল্প বয়সেই মকতবে গিয়ে পবিত্র কোরআন পড়া শিখে নিয়েছিল।মকতবের হুজুর মেজো ভাইয়ের প্রশংসায় ছিলো পঞ্চমুখ।আর তাই দাদা-দাদী চাচা-চাচী খুব ভীষণরকম ভাবে ন্সেহ করতো।যে আদর ন্সেহের কোন তুলনা হয়না।দাদা-দাদীতো মেজো ভাইকে কাছে না ডাকলে যেনো তাদের পেটের ভাতই হযম হতো না।মা-বাবাও মেজো ভাইয়ের শিক্ষা-দীক্ষা,আচার-আচরণে মুগ্ধ হয়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেতে দিধাবোধ করতো না।সমাজের সবাই মুখে মুখে বলাবলি করতো এই না হলে কি মাষ্টারের ছেলে।লোক মুখে মেজো ভাই আর বাবা কে নিয়ে এসব প্রশংসাবাণী শুনে আমার শিশু মনটাও খুশিতে গর্বে ভরে যতো।
বড়ই আফসোস আর বুকভরা কষ্ট-ব্যথা নিয়ে বলতে হচ্ছে।আমার সেই প্রাণপ্রিয় মেজো ভাই গত ২২ বছর পূর্বে আমাদের সবাইকে অশ্রুজলে ভাসিয়ে মহান মাওলার ডাকে সারা দিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে।শুধু রেখে গেছেন অসংখ্য অসংখ্য স্মৃতি।যা কোনদিন ভুলিবার নয়।
আজ শত ব্যথা বেদনা ভরা হৃদয়ে আল্লাহর দরবারে অধমের ফরিয়াদ।তিনি যেনো আমার মেজোভাইকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।আমীন,ছুম্মা আমীন।
`
প্রবাসীকাল ডটকম:মালয়েশীয়া প্রতিনিধি

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close