আদর্শ রমণীইসলামনারী অঙ্গনব্রেকিংস্লাইডার

স্বপ্নচারী এক আরব্য নারী

পবিত্র মাহে রমযান। পূণ্যের মাস। কুরআন নাযিলের মাস। পাপ মোচনের মাস। ইসলামের পুণ্যভূমি মদীনায় লাখো লাখো মুসল্লি এবং ওমরা আদায়কারীদের সমাবেশ। হৃদয়ে পরিচ্ছন্ন ভালোবাসা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি। রমজানের পহেলা রজনী। মসজিদে নববী থেকে তারাবীহ পড়ে আমি আর নূরুল আলম ভাই “বাঙালী মার্কেট”র দিকে হাটছিলাম। উনি ‘যাকাত ব্যবস্থাপনা’র উপর এমফিল করছেন। উনার স্বপ্ন যাকাত আদায় ও বণ্টন ব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন না হলেও যৌথ উদ্যোগে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে বাস্তবায়ন হোক। এতে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরয প্রতিষ্ঠা ও দারিদ্র্য বিমোচনে গঠনমূলক ভূমিকা পালিত হবে। ঐ দিক থেকে ইকবাল ভাই আসছিলেন আমাদেরকে রিসিভ করতে। উনিও সবেমাত্র অনার্স শেষ করেছেন। এখন একটি মসজিদের দায়িত্বে আছেন। এবার গন্তব্য সুকুল খুদর বা মদীনার “কাঁচা বাজার”।

ইকবাল ভাইকে আগেই ফোন করে জানিয়ে রেখেছিলেন নূরুল আলম ভাই। রমজানে ভোর রাতের সেহরীর জন্য কিছু কেনা কাটা প্রয়োজন। ব্যাচেলর জিন্দেগি। ক্যান্টিন বন্ধ চার মাসের জন্য। আর খোলা থাকলেও বাঙালী রুচির চাহিদা মেটাতে তারা অক্ষম। ইকবাল ভাই আসলেন। তবে আর বাজার করতে যাওয়া হলো না। জোড় আবদার আজকের সেহরি উনার বাসায় খেতে হবে। তবে উনিও ব্যাচেলর। সবাই একসাথে যাবো। রান্নাবান্না করব। তার পরে একইসাথে পেটে চালান হবে। নুরুল আলম ভাইয়েরও নাকি আজকে বাইরে খুব ঘুরতে ইচ্ছে করছে। গাড়িতে করে। তাই ইকবাল ভাইয়ের প্রস্তাবে সোজা রাজি হয়ে গেলেন। উনি মসজিদে নববী থেকে প্রায় বিশ/ বাইশ কিলোমিটার দূরে থাকেন। এখান থেকে আমাদেরকে উনার বাসায় নিয়ে যাবেন। আবার বাসা থেকে বিশ বাইশ কিলোমিটার দূরে ইউনিভার্সিটিতে পৌছিয়ে দেবেন। বাহ! দাওয়াতের ভালোই আক্কেল সেলামি। তবে তার মধ্যে আন্তরিকতা ছাড়া বিরক্তির রেশ মাত্র ছিলোনা। আর ছাত্রদের মাঝে পারস্পরিক সৌহার্দ্য এমনই।

আমরা ওনার বাসায় পৌছলাম। একতলা বিশিষ্ট মসজিদ সংলগ্ন মোটামুটি প্রশস্ত একটি কক্ষ সাথে ছোট্টখাট্টো কিচেন রুম ও বাথরুম। উনি এই মসজিদের ইমাম উনার দরজা সংলগ্ন পাশাপাশি আরেকটি দরজা। সামনে রাস্তা থেকে আড়াল করা হয়েছে পাঁচিল দিয়ে। এখানে কে থাকে? জিজ্ঞাসিলুম আমি।

ইকবাল ভাই: সত্তরোত্তীর্ণ ‘উম্মে আব্দুর রহমান’ নামে এক বৃদ্ধ মহিলা। কি? মসজিদের পাশে? আমার চোখ দুটো তখন বিস্ময়ে ছানাবড়া! উনার সাথে আর কে কে থাকে? না, আর কেউ না। উনি একাই থাকেন। উনার স্বামী? বাচ্চাকাচ্চা? কেউ নেই ? বিস্ময় যেন বেড়েই চলছে! স্বামী অনেক আগেই পরপারে আল্লাহর রহমতের ছায়ায়  আশ্রয় নিয়েছেন। ছয় পুত্র সন্তাননের সার্থক জননী তিনি। সবাই শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। প্রথম ছেলে আব্দুর রহমান একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মুদীর/ প্রিন্সিপাল। তার ছোট জন ইউসুফও একজন মাদরাসা শিক্ষক। তৃতীয় জন বকর, পেশায় মুহান্দিস/ ইঞ্জিনিয়ার, মুজাম্মা মালিক ফাহাদ (একাধিক ভাষায় মুদ্রিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ কুরান ছাপা খানা ও ফ্রি বিতরণ কেন্দ্র) র কর্মকর্তা। তার ছোট জন উসামা সেনাবাহিনীর অফিসার। পঞ্চম জন মাজেদ ভারতে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসের মুদাররিস। বার্ষিক ছুটিতে দেশে আসেন । সবার ছোট জনও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা।

ছেলেদের দিকে তাকালেই বুঝা যায় বাগানের মালিনী কতটা ভালোবাসা ও শ্রম ব্যয় করেছেন বাগান পরিচর্যায়। সবাই নিজ নিজ পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে আলাদা আলাদা থাকে। শুধু মাকে রাখার মতো কারো সময় সুযোগ ও সামর্থ্য নেই। রক্তে কেন যেন হিমশীতল শক খেয়ে গেলো। ভিতরটা যেন ধুমড়েমুচড়ে উঠলো। আবার চঞ্চল হয়ে প্রশ্নবাণ ছুড়লাম। ওনার ভরণপোষণ কে করে? উনি নিজেই। কিভাবে?

ইকবাল ভাই: উনাকে আমি প্রতিদিন বিকালে মসজিদে বেলালের পাশে দিয়ে আসি রাত দশটার পরে নিয়ে আসি। সেখানে উনি ফুটপাতে মাল ও পানি বিক্রি করেন।

পানি যা বিক্রি করেন তার অর্ধেকই পথচারীদেরকে ফ্রি দিয়ে দেন। আর অন্যান্য মাল বিক্রি করে যা লাভ হয় তা দিয়ে নিজের ভরণপোষণ চালান। এই বৃদ্ধ বয়সেও নিজে খেটে খাওয়ার স্বভাব। ব্যবসা করেন হালাল ব্যবসা। হোক তা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তবুও হালাল রুজি। আর এক সময় তিনি মসজিদে নববীর মহিলা সেকশনে চাকরী করতেন। একটু একটু টাকা জমিয়ে তিনি এই জমিটি ক্রয় করেন। তার পর রক্ত মাংস পানি করে ধীরেধীরে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই মসজিদের প্রতিটি ধূলিকণা, ইট সুরকি, রড সিমেন্ট তার তিলে তিলে জমানো সম্পদের আবহমান সাক্ষ্য ধারণ করে আছে ও কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এমনকি তিনি চাকরীর রিটায়ার্ড থেকে যা ভাতা পান তা দিয়েই ইমাম সাহেবের বেতন ও মসজিদের অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বহন করেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও তার পর্দার অনুশীলন ও ধার্মিকতার কোন কমতি নেই। যখনি কোন প্রয়োজনে দরজায় টোকা দেই এক মিনিটে বোরকা, নেকাব ও মৌজা পড়ে দরজা খুলেন। ভোর রাতে শুনা যায় যিকিরের মৃদু আওয়াজ।

বর্তমান এই জমিটি বিক্রি করলেও কয়েক কুটি টাকা পেতেন বা বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিলেও মাসিক কয়েক লক্ষ টাকা ভাড়া পেতেন। কিন্তু তিনি সেখানে মসজিদ নির্মাণ করে জায়গাসহ ওয়াক্ফ করে দিয়েছেন মসজিদের নামে। তার স্বপ্ন,তার স্বত্বা, তার ভুবন জুড়ে যেন একটি ঘর।একটি জান্নাতি ঘর। একটি মসজিদ। দাঁড়িয়ে রয়েছে স্বগর্ভে। ততক্ষণে ইকবাল ভাই রান্নাবান্নার কাজ সেড়ে নিয়েছেন। আজকের সেহরির স্পেশালিটি তেলাপিয়া ভুনা ও সিদ্ধ ডিম। তবে আমার দেহ মন এবং মগজ জুড়ে তখন শুধু বৃদ্ধার প্রতি অগাধ ভালবাসা, বেদনা ও শ্রদ্ধা।

19389630_1228264617301109_656225079_nলেখকঃ হিযবুল্লাহ আল নোমান
মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close