বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিব্রেকিংস্লাইডার

বাংলাদেশী যুবকের আবিষ্কার >> নিষিদ্ধ পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল তৈরির যন্ত্র!

নিষিদ্ধ পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল, এলপি গ্যাস ও কার্বন কালি তৈরির যন্ত্র আবিষ্কার করে সাড়া ফেলেছেন জামালপুরের তরুণ উদ্ভাবক তৌহিদুল ইসলাম তাপস। নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম নেয়া এই সম্ভবনাময় উদ্ভাবক অর্থের অভাবে তেল, গ্যাস ও কার্বন কালি তৈরির পরীক্ষামূলক প্লান্ট স্থাপন করতে পারছেন না বিষয়টি জানার পর একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের ফান্ড থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত বছর ২১ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে এটুআই প্রকল্পের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তৌহিদুল ইসলামের সাথে।

বর্জ্য শোধনাগার কেন্দ্রের পাশে জমি বরাদ্দ দিয়েছে জামালপুর পৌরসভা। গত বছর ২১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জমি বরাদ্দের জন্য নির্দেশ দেয় জামালপুর পৌরসভাকে। এ নির্দেশের পর জামালপুর পৌরসভা ২০ ডিসেম্বর পাইলট প্রকল্পের জন্য ৩ বছর মেয়াদে দেড় একর জমি বরাদ্দ দিয়েছে।

এই টাকায় তিনি পলিথিন থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাস তৈরির জন্য কাজ শুরু করার প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছেন।

উদ্ভাবক তৌহিদুল ইসলাম তাপস পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ১০ বছর বয়সের সময় বাড়ির আঙ্গিনায় ফুলের বাগান করি। বাগানে পড়ে থাকা পলিথিন ফুল গাছের পানি শোষণ ও বেড়ে উঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। আগুন লাগিয়ে ও এসিড দিয়ে পুড়িয়ে পলিথিন ধ্বংস শুরু করি। কিছুদিন না যেতেই ফের পলিথিন জমে বাগানে। পলিথিনের উৎপাতে অতিষ্ট হয়ে উঠি। কিভাবে পলিথিন ধ্বংস করা যায় মাথায় নানা আইডিয়া ঘুরপাক খেতে থাকে। সেই আইডিয়া থেকেই চেষ্টা করতে থাকি। তখন আমি সবেমাত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। পলিথিন ধ্বংসের একটু একটু ফল পেতে থাকি। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই।

তিনি বলেন, আমার এই উদ্ভাবনী নেশার পাশে পাই কলেজের রসায়নের প্রভাষক ইকরামুজ্জামান স্যারকে। তিনি গবেষণা কাজে সহায়তা করেন বিজ্ঞানাগার থেকে এসিড, টেস্টটিউব সবশেষে বিজ্ঞানাগারের চাবি দিয়ে দেন। দীর্ঘ গবেষণার একপর্যায়ে দেখতে পাই উচ্চ তাপমাত্রায় (৭শ’ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে) উত্তপ্ত করার সময় পলিথিন যখন তরল হয় তখন স্ববিভাজন বিক্রিয়া ঘটে। স্ববিভাজন বিক্রিয়া ঘটার পর জ্বালানি তেলের বাষ্প সৃষ্টি হয় এবং সেখানে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টির ফলে জ্বালানি তেলের বাষ্প খুব দ্রুত অন্য একটি শীতল চেম্বারে চলে আসে। পরে তা ঠাণ্ডা হয়ে তরল হয়ে যায় আর মিথেন বা এলপি গ্যাস ও জ্বালানি তেল আলাদা-আলাদা ভাবে নিজ নিজ চেম্বারে চলে যায়। তরল জ্বালানি ও এলপি গ্যাস বের হওয়ার পর সেখানে অনেক মুক্ত কার্বন তৈরি হয়, যা পরে ছাপার কাজে কালি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের টাকায় তৌফিক পরীক্ষামূলক ১৫০ কেজি সাপোর্টের একটি প্লান্ট বসিয়েছেন। এই পলিথিন থেকে ১০৫ লিটার পেট্রল, ডিজেল ছাড়াও এলপি গ্যাস উৎপাদন হবে। দিনে ৩ বার এভাবে তেল সংগ্রহ করা যাবে। এতে প্রতিদিন ৩১৫ লিটার পেট্রল, ডিজেল, এলপি গ্যাস ছাড়াও পাওয়া যাবে কার্বন কালি।

তরুণ উদ্ভাবক তৌহিদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার যদি তাকে সহযোগিতা করে প্রতিদিন ৫ হাজার সাপোর্টে একটি প্লান্ট করে দেশকে পলিথিনমুক্ত এবং জ্বালানি তেলে সাপোর্ট দেয়া সম্ভব হবে।

জামালপুর সদরের কেন্দুয়া ইউনিয়নের কোজগড়ের মঙ্গলপুরে তৌহিদুলের বাড়ি। তার বাবার নাম আব্দুল মান্নান ও মা হালিমা খাতুন।

তৌহিদুল ২০০৯ সালে জামালপুর সদর উপজেলার নারিকেলি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর জামালপুর কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে উত্তীর্ণ হন। তৌহিদের এই উদ্ভাবনী কাজে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন তার মা হালিমা বেগম।

শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মো. ইকরামুজ্জামান বলেন, তৌহিদের ইচ্ছা, একাগ্রতা, উদ্ভাবনী প্রতিভা দেখে নানাভাবে সার্পোট দেয়ার চেষ্টা করেছি। তৌহিদ একদিন জামালপুর নয় বাংলাদেশের মুখ উজ্জল করবে তার উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে।

স্থানীয় পরিবেশ কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, পলিথিন আমাদের পরিবেশের জন্য একটি মারাত্মক অভিশাপ। এই পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাস সংগ্রহের পাশাপাশি আমাদের শহর তথা গোটা দেশকে পলিথিনমুক্ত করার উদ্যোগ প্রশসংনীয় বলে মনে করছেন এই পরিবেশ কর্মী।

পরিত্যক্ত পলিথিন যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সেই পলিথিনকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আবিষ্কার করে ইতোমধ্যে তৌহিদুল যে সফলতা পেয়েছে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে জানিয়েছেন জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবির।

তিনি পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, তৌহিদ তার এই সফলতায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ অনুদান পেয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। সে বিভিন্ন সময় জেলা প্রশাসনের বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিয়ে সফলতা লাভ করেছে। আমরা তার এই সফলতা স্বার্থক করতে সার্বিক সহযোগিতা করে যাবো।

উৎসঃ পরিবর্তন

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Close